Home » » কৌতুক পর্ব গোপালভাঁড় ছোট গল্প

কৌতুক পর্ব গোপালভাঁড় ছোট গল্প

কৌতুক পর্ব গোপালভাঁড় ছোট গল্প


১৭ শতাব্দীতে গোপাল ভাঁড়ের জন্ম হয় কৃঞ্চনগরের এক নিম্নবিত্ত বাঙালী পরিবারে। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার সুযোগ না পেলেও, তিনি তার বুদ্ধিদীপ্ত বাদানুবাদ ও ব্যবহারের জন্যে ভীষন পরিচিতি লাভ করেন। হাস্য-রস ও বুদ্ধিদীপ্ত আচরনের জন্য কৃঞ্চনগরের (বর্তমান পশ্চিমবাংলার নদীয়া অঞ্চল) রাজা কৃঞ্চচন্দ্র তাকে রাজ্যসভায় স্থান দিয়েছিলেন। তিনি হাস্য-রস দিয়ে রাজাকে আমেদিত করতেন এবং অনেক সমস্যা সুরাহায় সাহায্য করতেন।


১. নবাবের খেয়াল
নবাবদের খেয়ালের অন্ত নেই। একবার নবাবের খেয়াল হলো- মাটির নীচে কি আছে তা জ্যোতিষী পণ্ডিত দ্বারা গণনা করিয়ে নিতে হবে। আর গণনা সত্য কি মিথ্যা তা তো সঙ্গে সঙ্গে কিছু মাটি খুঁড়েই বোঝা যাবে।

মাটির নীচে কি আছে সঠিকভাবে বলে দিতে পারলে- নবাব প্রত্যেক পণ্ডিতকে এক হাজার আশরফি করে পুরস্কার দেবেন। না বলতে পারলে আজীবন কারাবাস।

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র কিছু দরিদ্র জ্যোতিষী পণ্ডিতকে নবাব-দরবারে পাঠিয়েছিলেন- তারা কেউ মাটির নীচে কি আছে বলতে না পারায় কারাগারে রয়েছে। এমন খবর পেয়ে স্বভাবতঃই রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বিষণ্ণ মুখে বসেছিলেন, তিনি ভাবছিলেন একমাত্র তাঁরই দোষে এতগুলো ব্রাহ্মণ পণ্ডিতকে নবাবের কারাগারে পচে মরতে হবে।

সদাহাস্যময় গোপাল মহারাজের ঐ ভাব দেখে বলল- মহারাজ, অমন গোমরামুখ করে বসে আছেন কেন?

মহারাজ গোপালের কাছে সব ঘটনা বলেলেন। গোপাল শুনে বলল- এর জন্য ভাবনা কি? আপনি নবাবের কাছে একটি চিঠি দিন যে, একজন বড় জ্যোতিষী পাঠালাম, যিনি অনায়াসে মাটির নীচে কি আছে গণনা করে বলে দিতে পারেন।

মহারাজ অবাক হয়ে বললেন- গোপাল, তুমি গণনা করবে?

-কি করব জানি না। তবে নিজেও বেঁচে আসব, আর দরিদ্র ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণকে নবাবের কারাগার থেকে মুক্ত করে আনবো, তাছাড়া আপনার সম্মানও অক্ষুণ্ণ রাখব।

মন্ত্রী বললেন-এ অসম্ভব।

গোপাল বলল-আপনারা আমার ওপর আস্থা রাখতে পারেন। আমি সহজেই কার্যসিদ্ধ হয়ে ফিরে আসব।

মহারাজ বললেন- তুমি যদি দরিদ্র জ্যোতিষী পণ্ডিতদের নবাবের কারাগার থেকে মুক্ত করে আনতে পার- আমি তোমাকে হাজার টাকা পুরস্কার দেব।

গোপাল বাড়ি ফিরে গিয়ে ভাঙা খাটের একটা ভাঙা পায়াকে চৌদ্দ পর্দা শালুর কাপড় দিয়ে বেশ ভালভাবে জড়িয়ে নিল। গরদের কাপড়, গরদের চাদর, কাঁধে নামাবলী, মাথায় লম্বা টিকি ঝুলিয়ে এবং চৌদ্দ পর্দা কাপড়ে জড়ানো খাটের পায়াখানা হাতে নিয়ে নবাব-দরবারে গিয়ে উপস্থিত হ’লো।

নবাবকে যথোচিত সেলাম জানিয়ে বলল- খোদাবন্দ, আমাকে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র আপনার দরবারে পাঠিয়েছেন। মাটির নীচে কি আছে- আমি তা অনায়াসেই গণনা করে বলে দিতে পারি।

গোপালের কথা শুনে নবাব খুব সন্তুষ্ট হয়ে বললেন- আপনার চেহারা দেখেই বুঝতে পেরেছি- আপনি একজন মহান পণ্ডিত। আপনি আসন গ্রহন করুন এবং একটু বিশ্রাম করে বলুন- মাটির নীচে কি আছে।

গোপাল নির্দিষ্ট আসনে বসে- চৌদ্দ পর্দা জড়ানো খাটের পায়ার তিন পর্দা সরিয়ে মন্ত্র পড়বার ভাণ করে, নবাবকে বলল- হুজুরালি, সর্বং সারং খট্টাঙ্গ পুরাণম্। হিন্দু পণ্ডিতং ন শক্যং ভূতলগণনম্।

- পণ্ডিতমশাই, আপনার এ শ্লোকের অর্থ কি?

গোপাল মুচকি হেসে বলল- হুজুরালি, অষ্টাদশ পুরাণের সার এই খট্টাঙ্গ পুরাণ। এতে বলছে মাটির নীচে কি আছে- তা কোন হিন্দু পণ্ডিতই গণনা করে বলতে পারবে না।

গোপালের কথা শুনে নবাব বললেন- তবে কারা এরূপ গণনা করতে পারবে মহাশয়?

গোপাল বলল- সেকথাও উল্লেখ আছে নবাব সাহেব। যবন বা ম্লেচ্ছং ভূতলগনং শক্যং। হিন্দু পণ্ডিতা পৃথিবী বা তদূর্ধ্বং। অর্থাৎ যবন বা ম্লেচ্ছগণকে মরবার পরে মাটির নীচে কবর দেওয়া হয়। অতএব যবন বা ম্লেচ্ছ পণ্ডিতগণ ভূতলের নীচে কি আছে অনায়াসে গণনা করে বলে দিতে পারবে। আর যেহেতু হিন্দু পণ্ডিতগণ মরবার পর তাদের দাহ করা হয় অতএব হিন্দু পণ্ডিতগণ অনায়াসে মাটি ও উপরের আকাশে কি আছে সহজেই গণনা করে বলে দিতে পারবে। আপনি অনর্থক কতগুলো হিন্দু পণ্ডিতকে কারাগারে আটকে রেখে কষ্ট দিচ্ছেন।

গোপালের যুক্তিপূর্ণ কথা ও শাস্ত্রবচন নবাবের খুব মনঃপূত হলো, তিনি সমস্ত হিন্দু পণ্ডিতকে মুক্ত করে দিলেন এবং প্রত্যেককে একশো টাকা পুরস্কার দিয়ে বদায় দিলেন।

তারপর গোপালের হাতে পাঁচশো টাকা দিয়ে বললেন- আপনি যথার্থ কথা বলেছেন পণ্ডিতমশাই। আপনি না বললে আমি অনেক হিন্দু পণ্ডিতকে অনর্থক কষ্ট দিতুম। এই সামান্য কিছু নিন। আমি এক্ষুণি কাঠমোল্লা পণ্ডিতদের ডেকে এনে মাটির নীচে কি আছে তা গণনা করাচ্ছি।

নবাবের কাছ থেকে পাঁচশ টাকা পুরস্কার পেয়ে, খট্টাঙ্গ পুরাণখানা হাতে নিয়ে গোপাল একরকম নাচতে-নাচতে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় এসে উপস্থিত হলো।

নবাবের কারাগার থেকে যেসব জ্যোতিষী পণ্ডিত মুক্ত হয়েছিল- তারাও এসে সকলেই মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় উপস্থিত হলো।

গোপালের মুখে সব ঘটনা শুনে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ও সভার সকলেই জয়ধ্বনি করে উঠল- জয় গোপালের জয়। জয় খট্টাঙ্গ পুরাণের জয়।

মহারাজ গোপালকে প্রতিশ্রুতিমত এক হাজার টাকা পুরস্কার দিয়ে বললেন- তোমার খট্টাঙ্গ পুরাণখানা একবার দেখাও তো।

গোপাল পুরস্কারের টাকা ট্যাঁকে গুঁজে খট্টাঙ্গ পুরাণের ওপরে জরানো চৌদ্দ পর্দা কাপড় সরিয়ে ফেলতেই খাটের একটি ভাঙা পায়া বেরিয়ে পড়ল। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় তুমুল হাসির রোল উঠল।

২. মাতৃভাষা
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় একজন লোক মাঝে মাঝেই আসত। সে লোকটা নানা ভাষায় কথা বলত। কি যে তার আসল মাতৃভাষা, কোথায় তার আসল দেশ কেউ জানতো না। সবগুলো ভাষাতেই সে সমান দক্ষ। প্রায় সবগুলো ভাষাতেই সে লিখতে পড়তে পারত। যেমন বাংলা বলত, তেমনি হিন্দী বলত, আবার ফার্সীও বলত।

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র একদিন গোপালকে বল্লেন, 'গোপাল, লোকটা কি জাতি এবং ওর মাতৃভাষাই বা কি, তুমি যদি ঠিক ঠিক বলতে পার- আমি তোমাকে পুরস্কার দেব'।

মহারাজের কথা শুনে গোপাল বলল, 'এ আর তেমন কষ্ট কি? আমি দু’দিনের মধ্যেই ঠিক বলে দিতে পারব'।

গোপালের কথা শুনে মন্ত্রী মশায় বল্লেন, 'ওহে গোপাল, কাজটা যত সোজা ভাবছ, ততটা সোজা নয়। লোকটা তোমার থেকেও সেয়ানা। ও সহজে ধরা দেবে না'।

গোপাল বলল, 'মন্ত্রী মশাই, আমার নামও গোপাল ভাঁড়। দেখবেন, আমি লোকটির আসল পরিচয় বের করে নেব'।

পরদিন গোপাল অনেক আগেই এসে রাজসভার দ্বারে একপাশে লুকিয়ে রইল। কারন, বিশেষ কাজে ঐ দিনই ঐ লোকটার রাজসভায় আসার কথা ছিল।

কিছুক্ষণ পরেই ঐ লোকটা এল। গোপাল বেরোতে যাবার ভাণ করে-আচমকা লোকটাকে ধাক্কা দিল, লোকটা একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়ে বলল, 'সঁড়া অন্ধা! দিনের বেলা চোখে দেখতে পাওনা? এই বয়সেই চোখের মাথা খেয়ে বসে আছ'?

গোপাল বলল, 'গালাগাল দাও, আর যাই বল- তুমি যে উড়ে আমি বুঝতে পেরেছি। হুমড়ি খেয়ে পড়ে গিয়ে তোমার মুখ থেকে সবার আগে যে ভাষা বেরিয়েছিল, ওটা-তোমার মাতৃভাষা-তুমি বাপু উড়ে'।

লোকটা শেষ পর্যন্ত স্বীকার করল যে, সে উড়ে।

মহারাজ সন্তুষ্ট হয়ে গোপালকে একশো টাকা পুরস্কার দিলেন।

৩. এরপর তোমার পালা
ছোটবেলা গোপাল ভাঁড় কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলে বুড়োরা তাকে ক্ষেপাত আর হাসত, ‘গোপাল, এর পর তোমার পালা।’

শুনে গোপালের খুব রাগ হত। বুড়োদের কিভাবে জব্দ করা যায়, সেই পথ খুঁজতে লাগল এবং এক সময় পেয়ে গেল।

শবদাহ আর শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে গিয়ে ঐসব বুড়োদের বলতে লাগল, ‘এর পর তোমার পালা!’

৪. জামাইটি খুবই ভালো, তবে......
গোপাল নন্দীগ্রামে যাবে শুনে গোপালের প্রতিবেশী এক গোঁড়া বৈষ্ণব এসে গোপালকে বলল, "নন্দীগ্রামের পরম বৈষ্ণব ত্রিলোচনের ছেলে বটুকের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। তুমি যখন নন্দীগ্রামে যাচ্ছ-তখন আমার জামাইয়ের একটু খোঁজ নিও। নিন্দুকেরা নানা কথা বলে কিন্তু আমার জামাইকে তোমার খুবই ভাল লাগবে। গোঁড়া বৈষ্ণব বংশের ছেলে, ভালো না হয়ে যায় কোথায়? অনেক বেছে বেছেই তো মেয়েকে ওখানে বিয়ে দিয়েছি"।

দিন সাতেক পরে গোপাল যখন নন্দীগ্রামে থেকে ফিরে এল, সেই বুড়ো বৈষ্ণব ভদ্রলোক তখন গোপালের কাছে জামাইয়ের খোঁজ নিতে এল।

-ওহে গোপাল, আমার জামাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে?

-দেখা হয়েছে বৈকি, আমি তো দিন সাতেক বলতে গেলে আপনার জামাইয়ের ওখানে ছিলাম।

-তাই নাকি? তবে তো ভালোভাবেই পরিচয় হয়েছে। আমার জামাইকে তোমার কেমন লাগল গোপাল?

-আপনার জামাইটি খুবই ভালো, তবে...

-তবে কি গোপাল? গোঁড়া বৈষ্ণব ওরা।

-একটু পেঁয়াজ খায় আর কি।

-বলো কি গোপাল, পেঁয়াজ খায়! ওর বাবা গোঁড়া বৈষ্ণব। বৈষ্ণবের ছেলে হয়ে পেঁয়াজ খায়?

-রোজ কি খায় তাই বলে? এই মাঝে মাঝে খায়, যখন একটু মাংস-টাংস খায়।

-কি বলছ গোপাল, আমার জামাই মাংস খায়? বৈষ্ণব বংশের ছেলে হয়ে মাংস খায়- এ যে আমি ভাবতেই পারছি না একদম।

-এতে ঘাবড়াবার কিছু নেই, রোজ কি আর মাংস খায় নাকি? এই যখন একটু টানে তখনই খায়।

-টানে মানে? সে তামাক খায় নাকি?

-না তামাক নয়।গুরুজনের সামনে তামাক খাবে কি করে? টানে মানে- যখন একটু মদ টানে। তবে আপনার জামাইয়ের বেশ জ্ঞানগম্যি আছে বৈকি। সবার সামনেই কি আর মদ টানে, লুকিয়ে লুকিয়ে টেনে আসে।

-কি বলছ গোপাল, আমার জামাই মদ খায়?

-রোজ কি আর মদ খায় নাকি? এই যেদিন একটু এদিক-ওদিক যায়, সেদিন কেবল খায়।

-এদিক-ওদিক যায় মানে?

-এই পাড়ায়-টাড়ায় যায়। বুঝলেন না- বেশ্যা পাড়ায় মেয়েছেলেরা তো মোটেই ভাল নয়, ওদের পাল্লায় পড়ে মাঝে মাঝে মদ টানতে হয়।

গোপালের কথাশুনে বৈষ্ণব ভদ্রলোক আর স্থির থাকতে পারলেন না, অস্থিরচিত্তে বাড়ি ফিরে গেলেন। তারপর আর গোপালের কাছে কখনও জামাইয়ের খোঁজ নিতে আসেননি, নিজেও জামাইবাড়িতে আর বেড়াতে যাননি।

৫. ফতুয়া চুরি
গোপাল যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ি। মাথার ওপর গনগনে সূর্য। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে গোপাল এক গাছের নিচে বিশ্রাম নিতে বসল। বেশি গরম লাগায় ফতুয়াটা খুলে পাশে রেখে একটু আয়েশ করে বসল। বসে বিশ্রাম নিতে নিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল, নিজেই জানে না।

ঘুম যখন ভাঙল গোপাল দেখে, তার ফতুয়াটা চুরি হয়ে গেছে। হায় হায়! এখন কী হবে! খালি গায়ে তো আর শ্বশুরবাড়ি ওঠা যায় না। কী আর করা।

সে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে বলতে লাগল, ‘হে ভগবান, রাস্তায় অন্তত ১০টি মুদ্রা যেন কুড়িয়ে পাই, তাহলে পাঁচ মুদ্রায় আমার জন্য একটা ভালো ফতুয়া কিনতে পারি। আর তোমার জন্য পাঁচটি মুদ্রা মন্দিরে দান করতে পারি···।’

আর কী আশ্চর্য! ভাবতে ভাবতেই দেখে, রাস্তার ধারে কয়েকটি মুদ্রা পড়ে আছে। খুশি হয়ে উঠল গোপাল, গুনে দেখে পাঁচটি মুদ্রা!

গোপাল স্বগত বলে উঠল, ‘হে ভগবান, আমাকে তোমার বিশ্বাস হলো না, নিজের ভাগটা আগেই রেখে দিলেন।

৬. শাশুরী-জামাই
পাড়া-পড়শী অনেকের বাড়িতেই মেয়ে-জামাই বেড়াতে এসেছে দেখে, গোপালের স্ত্রী একদিন গোপালকে বলল- তুমি কি গা! জামাই আনার নাম পর্যন্ত কর না। দু’বছর হয়ে গেল, একবারটি জামাইকে আনলে না?

স্ত্রীর কথা শুনে গোপাল বলল- জামাই আনা কি চাট্টিখানি কথা! কত খরচ বলতো?

গোপালের কথা শুনে গোপালের স্ত্রী বলল- তুমি দেখছি হাড় কেপ্পন হয়ে গেলে গো। রাজবাড়ি থেকে এত টাকা-পয়সা আনছ- সে টাকা-পয়সায় ছাতা পড়ে গেল। আমি কোন কথা শুনতে চাইনে- আজকালের মধ্যে জামাই না আনলে আমি বাপের বাড়ি চলে যাব।

গোপাল ভাবল, এবার আর জামাই না এনে উপায় নেই, তাই সে বিকেল বেলায় জামাই নিয়ে ফিরল।

জামাই আসবার পরও প্রায় একমাস হ’তে চলল, জামাই শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে নড়তে-চায় না। বসে বসে এমন চর্ব্য-চূষ্য-লেহ্য-পেয় পাবে কোথায়?

জামাই শাশুড়ীকে বলল- মা, এখানে এসে আমার শরীরটা বেশ ভাল হয়েছে, ভাবছি আরও কিছুদিন থাকব।

জামাইয়ের কথা শুনে শাশুড়ী বলল- তা তোমার যতদিন ইচ্ছা থাক না। তোমার শ্বশুর তো এখন দু’হাতে টাকা আনছে। যতদিন ইচ্ছে থাক।

শাশুড়ী ও জামাইয়ের কথোপকথন শুনে গোপাল মনে মনে প্রমাদ গুনল। না, আর নয়। যেভাবেই হোক, বুদ্ধি করে জামাই বাবাজীকে তাড়াতে হবে, নইলে যে জমানো টাকা ভাঙতে হবে। জামাই পোষা না হাতী পোষা!

মনে মনে ফন্দি এঁটে সে জামাইকে বলল- বাবাজী, এ পাড়ায় ভীষণ ছিঁচকে চোরের উৎপাত। এই যে দেখছ লেবুগাছটা, এতে হাজার হাজার লেবু এলেও- আমি সময়মত দেখতে পাই না, বেচলেও বেশ পয়সা হ’তো। তুমি বাপু একটু লেবু গাছটার দিকে নজর রেখো। সব সময় নজর রাখতে হবে না, বিশেষ করে সন্ধ্যের পরে একটু নজর রেখো। বাতি নিভিয়ে দু’চারদিন গাছের দিকে নজর রাখলে নিশ্চয় চোর ধরতে পারবে।

শ্বশুরের কথা শুনে জামাই বলল- আপনি কিছু ভাববেন না, চোর আমি ধরবই।

সেদিন সন্ধ্যেবেলা গোপাল রাজবাড়ি থেকে ফিরে বাড়ির ভেতর গিয়ে বলল- ওগো, পেটটা ভাল নেই। কি রকম ভুটভুট করছে। গাছ থেকে দুটো লেবু এনে একটু লেবুর সরবৎ করে দাও তো।

ঘরে আর অন্য কোন বাতি না থাকায় গোপালের স্ত্রী অন্ধকারেই লেবু আনতে গেল। জামাই চোর ধরার অপেক্ষায় আগে থেকেই ওৎ পেতে বসেছিল। চোর ভেবে শাশুড়ীকে জাপটে ধরল।

চীৎকার চেঁচামেচি শুনে গোপাল সঙ্গে সঙ্গে বাতি নিয়ে ছুটে গেল। তখনও জামাই শাশুড়িকে জড়িয়ে ধরে আছে।

গোপাল তাই দেখে বলল- তাই তো বলি, শাশুড়ীর এত জামাই আনার ধূম কেন?

গোপালের স্ত্রী ভীষণ লজ্জা পেয়ে রান্নাঘরে চলে গেল, জামাইও ভীষণ লজ্জা পেয়ে রাতের অন্ধকারে শ্বশুরবাড়ি ত্যাগ করল। গোপাল মনের সুখে বারান্দায় বসে তামাক টানতে লাগল

৭. মুখেই প্রস্রাব করি
গোপাল একবার তার দুই বেয়াই-এর সাথে এক জায়গায় যাচ্ছিল। পথের ধারে দক্ষিণমুখো হয়ে সে প্রস্রাব করতে বসলে এক বেয়াই বলল, “আরে করেন কি, আপনি জানেন না, দিনের বেলা দক্ষিণমুখো হয়ে প্রস্রাব করতে নেই, শাস্ত্রে নিষেধ আছে যে!”

অপর বেয়াই বলল, “শুনেছি উত্তরমুখো হয়েও নাকি ওই কাজটি করতে নেই।”

গোপাল বলল, “ওসব পন্ডিতলোকদের বচন, আমি গাঁইয়া মুখ্যুসুখ্যু মানুষ, ওসব বাছবিছার আমি করি না, সব মুখেই প্রস্রাব করি। বড় বেয়াই যে মুখে বললেন সে মুখে করি আর ছোট বেয়াই যে মুখে বললেন সে মুখেও করি।”

গোপালের মুখের কথা শুনে বেয়াইদের মুখে আর কথা নেই।

৮. পাঁঠা বলি
গোপাল একদিন পেটব্যথার যন্ত্রণায় ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিল, সে এক ভীষণ যন্ত্রণা। যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে সে রাজসভাতেই শুয়ে পড়ে বলতে লাগস- দোহাই মা কালী! আমার পেটের যন্ত্রণা কমিয়ে দাও মা, এ যন্ত্রণা আর সহ্য করতে পারছি না। মা- মাগো, আমার যন্ত্রণা ভালো করে দাও- আমি সাতদিনের মধ্যে তোমার কাছে জোড়া পাঁঠা বলি দেব।

কিছুক্ষণ পরে গোপালের যন্ত্রণার উপশম ঘটল, সে উঠে বসে একটা পান খেয়ে বলল- পেটের যন্ত্রণা তো এমনিতেই কমে যেত, এতে আর মা কালীর কেরামতি কোথায়? তবে আর মা কালীর কাছে জোড়া পাঁঠা বলি দিতে যাব কোন্ দুঃখে?

গোপাল দিব্যি খোশ মেজাজে গল্প করতে লাগল। কিন্তু আবার কিছুক্ষণ পরে ভীষণ যন্ত্রণা শুরু হলো। গোপাল কাটা ছাগলের মতই দাপাতে দাপাতে বলল- ওমা, মা কালী, আমি কি আর তোমায় জোড়া পাঁঠা দিতাম না? আমি তো উপহাস করছিলাম। এত বোঝ মা, উপহাস বোঝ না?

৯. রাজবৈদ্য নিয়োগ
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দরবারে রাজবৈদ্য নিয়োগ দেওয়া হবে। দেশদেশান্তর থেকে চিকিত্সকেরা এলেন যোগ দিতে। গোপালকে রাজা দায়িত্ব দিলেন চিকিত্সক নির্বাচনের। গোপাল খুশিমনে বসলেন তাঁদের মেধা পরীক্ষায়। —আপনার চিকিত্সালয়ের আশপাশে ভূতের উপদ্রব আছে? —জি আছে। প্রচুর ভূত। ওদের অত্যাচারে ঠিকমতো চিকিত্সা পর্যন্ত করতে পারি না। দিন দিন ওদের সংখ্যা বাড়ছেই। এবার দ্বিতীয় চিকিত্সকের পালা। —আপনার চিকিত্সালয়ের আশপাশে ভূতের উপদ্রব কেমন? —আশ্চর্য, আপনি জানলেন কীভাবে! ওদের জ্বালায় আমি অস্থির। দিন দিন ওদের সংখ্যা বাড়ছেই। এভাবে দেখা গেল সবার চিকিত্সালয়ের আশপাশেই ভূতের উপদ্রব আছে। একজনকে শুধু পাওয়া গেল, যাঁর কোনো ভূতসংক্রান্ত ঝামেলা নেই। গোপাল তাঁকে রাজবৈদ্য নিয়োগ দিলেন। পরে দেখা গেল এই চিকিত্সকই সেরা। রাজাও খুশি। একদিন রাজা ধরলেন গোপালকে। গোপাল বললেন, ‘আজ্ঞে মহারাজ, দেখুন, সবার চিকিত্সাকেন্দ্রের আশপাশে ভূতের উপদ্রব শুধু বাড়ছে আর বাড়ছে। এর অর্থ হলো, তাঁদের রোগী মরে আর ভূতের সংখ্যা বাড়ে…আর যাঁকে নিলাম, তাঁর ওখানে কোনো ভূতের উপদ্রব নেই…অর্থাত্ তাঁর রোগীএকজনও মরে না

১০. একই চেহারা
রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সব সভাসদদের সামনে গোপালকে জব্দ করার উদ্দেশ্যে বলছেন, ‘বুঝলে গোপাল, আমার সাথে তোমার চেহারার কিন্তু দারুণ মিল! তা বাবার শাসনামলে তোমার মা কি এদিকে আসতেন-টাসতেন নাকি?’

গদগদ হয়ে গোপাল বলে, ‘আজ্ঞে না রাজামশাই! তবে মা না এলেও বাবা কিন্তু প্রায়শই আসতেন!’

১১.গোপাল যখন মোড়ল
গোপাল একবার গ্রামের মোড়ল হয়েছিল। তো একদিন ভোরবেলায় এক লোক এসে ডাকতে লাগল, ‘গোপাল? গোপাল?’ গোপাল ভাঁড় কোনো উত্তর না দিয়ে শুয়েই রইল।

এবার লোকটা চিৎকার করে ডাকতে লাগল, ‘মোড়ল সাহেব, মোড়ল সাহেব।’ এবারও গোপাল কোনো কথা না বলে মটকা মেরে শুয়ে রইল।

গোপালের বউ ছুটে এসে বলল, ‘কী ব্যাপার, লোকটা মোড়ল সাহেব মোড়ল সাহেব বলে চেঁচিয়ে পড়া মাত করছে, তুমি কিছুই বলছ না!’

গোপাল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘আহা, ডাকুক না কিছুক্ষণ, পাড়ার লোকজন জানুক আমি মোড়ল হয়েছি।’

১২. ঈশ্বরের সেবা
একজন বৈরাগী গোপালকে চিনত না। সে গোপালের সামনে এসে বলল, “ঈশ্বরের সেবার জন্য আপনি কিছু চাঁদা দেবেন?”

গোপাল কিছু না বলে বৈরাগীকে একটা টাকা দিল।

টাকাটা পেয়ে বৈরাগী খুশি হয়ে পথ হাঁটতে লাগল। কিছুটা যেতেই গোপাল তাকে ডাকল, “ও বৈরাগী, একবারটি আমার কাছে এসো।”

বৈরাগী খুশিমনে তার কাছে আসলে গোপাল বলল, “তোমার বয়স কত?”

“আঠারো আজ্ঞে।”

“আমার বয়স পঞ্চান্ন।”

“তাতে কি হল?”

“এইমাত্র ঈশ্বরের সেবার জন্য যে একটা টাকা নিয়েছ সেটা ফেরত দাও, কারণ তোমার আগেই আমি স্বর্গে যাব এবং ঈশ্বরের সেবার সুবর্ণ সুযোগ পাব।”

১৩. বলদের মতোই
গোপালের তখন বয়স হয়েছে। চোখে ভালো দেখতে পারে না। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বললেন, কী গোপাল, গতকাল আসনি কেন?

—আজ্ঞে চোখে সমস্যা হয়েছে। সবকিছু দুটো দেখি। কাল এসেছিলাম। এসে দেখি দুটো দরবার। কোনটায় ঢুকব, ভাবতে ভাবতেই…।

—এ তো তোমার জন্য ভালোই হলো। তুমি বড়লোক হয়ে গেলে। আগে দেখতে তোমার একটা বলদ, এখন দেখবে দুটো বলদ।

—ঠিকই বলেছেন মহারাজ। আগে দেখতাম আপনার দুটো পা, এখন দেখছি চারটা পা…ঠিক আমার বলদের মতোই!

১৪. ভূত ছাড়ে
বেড়াতে বেরিয়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র একবার গোপালের হাত চেপে ধরে আস্তে আস্তে মোচড়াতে লাগলেন।

গোপাল: আমার হাত নির্দোষ, ওকে রেহাই দিন।

রাজা: জোর করে ছাড়িয়ে নাও।

গোপাল: সেটা বেয়াদবি হবে।

রাজা: উহু, তাহলে হাত ছাড়ব না।

গোপাল তখন যে রোগের যে দাওয়াই বলে রাম নাম জপতে থাকলেন।

রাজা: এতে কি আর কাজ হবে? দাওয়াই কোথায়?

গোপাল: রাম নাম জপাই তো মোক্ষম দাওয়াই।

রাজা: মানে?

গোপাল: পিতামহ, প্রপিতামহের আমল থেকে শুনে আসছি, রাম নাম জপলে ভূত ছাড়ে।

রাজা গোপালের হাত ছেড়ে দিলেন সঙ্গে সঙ্গে।

১৫. মদ্দা হাঁস না মাদি হাঁস:
রাজা কষ্ণ চন্দ্রের রাজ সভায় গোপাল ভাঁড় ছিলেন সবার প্রিয় তবে অনেকের সাথে তার পাল্লা লেগে থাকত সব সময়।

অনেকে গোপালকে বিভিন্ন উপায়ে ঠকাবার চেষ্টা করতেন। একদা হয়েছিল কি? গোপালের অজান্তে রাজ সভায় পরিকল্পনা হল আজ গোপালকে যেভাবেই হোক ঠকাতে হবে। যেই কথা সেই কাজ।

তো প্লান ঠিক হল যে, প্রত্যেকের কোমরে ১টা করে হাঁসের ডিম দেওয়া হবে কিন্তু গোপালকে দেওয়া হবে না সবাই পুকুরে ডুব দিয়ে উঠে আসবে আর ১টা করে ডিম দেখাবে। ঘটনাটি দেখার জন্য উৎসুক লোকের ভীড় জমতে শুরু করল।

তো কথা ও পরিকল্পনা মত একে একে সবাই ডুব দিয়ে ডিম আনতে লাগল গোপাল পুকুরে নামল সবার শেষে কিন্তু গোপাল ডুব দিয়ে ডিম আনতে ব্যর্থ হল। সবাই চারিদিক থেকে চিৎকার করতে লাগল যে গোপাল পারেনি।

কিন্তু সবাই শান্ত হলে গোপাল গম্ভীর গলায় বলল 'আরে আমিত মদ্দা হাঁস, মদ্দা হাঁস ডিম ডিম পাড়তে কোত্থেকে? ডিম পাড়ে তো মাদি হাঁসে। উপস্থিত সকলে গোপালের কথা শুনে থ মেরে গেল।

রাজা কৃষ্ণ চন্দ্রও বলে উঠলেন নাহ গোপালের সাথে পারা গেল না।

১৬. নবাবের ইচ্ছা
গোপাল একবার তার দুই বেয়াই-এর সাথে এক জায়গায় যাচ্ছিল। পথের ধারে দক্ষিণমুখো হয়ে সে প্রস্রাব করতে বসলে এক বেয়াই বলল, “আরে করেন কি, আপনি জানেন না, দিনের বেলা দক্ষিণমুখো হয়ে প্রস্রাব করতে নেই, শাস্ত্রে নিষেধ আছে যে!”

অপর বেয়াই বলল, “শুনেছি উত্তরমুখো হয়েও নাকি ওই কাজটি করতে নেই।”

গোপাল বলল, “ওসব পন্ডিতলোকদের বচন, আমি গাঁইয়া মুখ্যুসুখ্যু মানুষ, ওসব বাছবিছার আমি করি না, সব মুখেই প্রস্রাব করি। বড় বেয়াই যে মুখে বললেন সে মুখে করি আর ছোট বেয়াই যে মুখে বললেন সে মুখেও করি।”

গোপালের মুখের কথা শুনে বেয়াইদের মুখে আর কথা নেই।

১৭. নবাবের ইচ্ছা
রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সব সভাসদদের সামনে গোপালকে জব্দ করার উদ্দেশ্যে বলছেন, ‘বুঝলে গোপাল, আমার সাথে তোমার চেহারার কিন্তু দারুণ মিল! তা বাবার শাসনামলে তোমার মা কি এদিকে আসতেন-টাসতেন নাকি?’

গদগদ হয়ে গোপাল বলে, ‘আজ্ঞে না রাজামশাই! তবে মা না এলেও বাবা কিন্তু প্রায়শই আসতেন!’

১৮. নবাবের ইচ্ছা
গোপাল একবার গ্রামের মোড়ল হয়েছিল। তো একদিন ভোরবেলায় এক লোক এসে ডাকতে লাগল, ‘গোপাল? গোপাল?’ গোপাল ভাঁড় কোনো উত্তর না দিয়ে শুয়েই রইল। এবার লোকটা চিৎকার করে ডাকতে লাগল, ‘মোড়ল সাহেব, মোড়ল সাহেব।’ এবারও গোপাল কোনো কথা না বলে মটকা মেরে শুয়ে রইল।

গোপালের বউ ছুটে এসে বলল, ‘কী ব্যাপার, লোকটা মোড়ল সাহেব মোড়ল সাহেব বলে চেঁচিয়ে পড়া মাত করছে, তুমি কিছুই বলছ না!’ গোপাল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘আহা, ডাকুক না কিছুক্ষণ, পাড়ার লোকজন জানুক আমি মোড়ল হয়েছি।’

১৯. নবাবের ইচ্ছা
একবার মুর্শিদাবাদের নবীন নবাব সিরাজউদ্দোলা বেড়াতে বেড়াতে কৃঞ্চনগর রাজ্যে এসে পৌঁছালেন। রাজার পিতৃশ্রাদ্ধের জন্যে রাখা ষাড়টি আলগা খেয়ে খেয়ে আরো মোটা তাজা হয়ে উঠেছে। একদিন নবাবের সামনে এসে পড়ল ষাড়টি।

ভোজন বিলাসী নবাব আলগা ষাড়টি মালিকবিহিন মনে করে ধরে নিয়ে গেলেন তার ক্যাম্পে। মজাদার ভোজ হবে ষাড়টি দিয়ে।

খবরটি পৌঁছল রাজা কৃষচন্দ্রের কাছে। চিন্তায় পড়লেন তিনি। ষাড়টি ফেরৎ চেয়ে নবাবকে ক্ষ্যাপানো ঠিক হবে না। তাছাড়া তার রাজ্যে মুসলমান নবাব গরু জবাই করে খেলেতো হিন্দু ধর্মের আর মান থাকবে না। চিন্তায় চিন্তায় বিষন্ন হলো রাজা।

গোপাল দরবারে এসে জানতে চাইলো রাজা এতো বিষন্ন কেন। ঘটনা শুনে গোপাল রাজাকে অভয় দিয়ে বললো, “আমি অনায়াসে ষাড়টাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারবো”।

রাজা বললো, “দেখিস, নবাব যেন ক্ষেপে না যায়”। রাজাকে সম্নান জানিয়ে গোপাল রওয়ানা হলো নবাবের ক্যাম্পের দিকে।

গোপালের হাসি-ঠাট্টা নবাবের অজানা নয়। অনেক হাস্য-রস বিনিময়ের পর গোপাল জিজ্ঞেস করলো, “নবাব সাহেব, এই ষাড়টি এখানে বাঁধা রয়েছে কেন?”

“ষাড়টি জবাই করে বিরাট এক ভোজের আয়োজন করছি কাল,” বললো নবাব।

গোপাল বললো ,“হুজুর হলেন দয়ার সাগর, বেড়াতে এসেও কৃষনগরের লোকদের উপকার করতে ভুলেননি। নবাব কিছু বুঝে উঠতে পারলোনা।

জিজ্ঞেস করলো, “ভোজের জন্যে ষাড় জবাই দেবো – এতে কৃষনগরের লোকের উপকার হবে কিভাবে?”

গোপাল জানালো, “নবাব বোধহয় জানেন না যে এই ষাড়টি শাক-সবজি নয় মানুষের মল ও শুকুরের বিষ্ঠা খেয়ে এতো নাদুস নুদুস হয়েছে। ফলে ষাড়টির গায়ে ভীষন গন্ধ এবং এলাকার লোকজন এটাকে বিদায় করতে পারলেই বাঁচে”।

নোংরা খাবার খেয়ে ষাড়টি নাদুস-নুদুস হয়েছে কথাটা ভেবে নবাবের ভোজের জন্যে ক্ষুধা মিটে গেল! তিনি আদেশ দিলেন ষাড়টি দুরে কোথাও ছেড়ে দিয়ে আসতে। গোপাল নবাবকে সেলাম ঠুকে ক্যাম্প থেকে বের হয়ে গেল। রাজা কৃষচন্দ্র ষাড়টি ফিরে পেয়ে গোপালকে পুরস্কার দিলেন।

২০. গোপালের ভুল ভাঙ্গানো
অন্য একটা গল্পে আছে যে গোপালের এক দরিদ্র প্রতিবেশী ছিলো। লোকটি অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো করার চিন্তায় সবরকম দিবা স্বপ্নে বিভোর থাকতো।

একদিন সে তার স্ত্রীকে বললো, “আমার কিছু টাকা হলে কয়েকটা গাভী কিনবো”।

স্ত্রী বললো, “আজ্ঞে, তা’হলে আমাদের অনেক দুধ থাকবে। দুধ দিয়ে ঘি ও মাখন বানাবো”।

স্বামী বললো, “ দুধ ও ঘি বিক্রি করে অনেক টাকা করতে পারবো”।

স্ত্রী বললো, “বেশী দুধ হলে আমার বোনকে কিছুটা দিতে পারবো”।

স্বামী বললো, “সেকি কথা? তোমার বোনকে কোন দুধ দেয়া যাবে না। বরং অতিরিক্ত দুধ বিক্রি করে সংসারে আরো টাকা আনবো”।

এভাবে বাদানুবাদে স্বামী-স্ত্রীতে ঝগড়া বেধে গেল।

স্বামী আরো বললো, “আমি যখন বাড়ীতে থাকবো না তখন যেন আমার অনুপস্থিতিতে তোমার বোনকে চুপি চুপি দুধ দিতে না পারো তার ব্যবস্থা আমি করছি”।

এ-কথা বলে সে বাড়ীর হাড়িগুলো ভাঙ্গতে লাগলো। স্বামী বললো, “তোমার হাড়ি সব ভেঙ্গেঁ দিচ্ছি। হাড়ি না থাকলে তুমি তোমার বোনকে আর দুধ দিতে পারবে না”।

তখন তাদের বাড়ীর পাশ দিয়ে গোপাল যাচ্ছিল। লোকটির হাড়ি ভাঙ্গার কর্ম দেখে জিজ্ঞিস করলো, “হ্যাগো হাড়ি ভাঙ্গছো কেন?”

সব শুনে গোপাল তার হাতে থাকা একটা বাঁশের লাঠী মাথার উপর শূন্য আকাশে খোঁচা দিতে থাকলো।

গোপালের ব্যবহার দেখে প্রতিবেশী জিজ্ঞেস করলো, “ গোপাল বাবু তুমি লাঠি দিয়ে শূন্যে খোঁচা দিচ্ছ কেন?”

গোপাল উত্তর করলো “তোমার গরু তাড়িয়ে দিচ্ছি। তারা আমার সবজি বাগানের শশা খেয়েছে”।

লোকটি আশ্চার্য হয়ে বললো, “ তোমার বাগানের শশা খেয়েছে? তোমারতো কোন সবজী বাগানই নেই! শশা আসবে কোথা থেকে?”

গোপাল বললো, “একদিন আমার বাগান হবে। তখন বাগানে অনেক শশা ফলবে”।

এ কথা বলে গোপাল আবার আকাশের দিকে লাঠি দিয়ে খোঁচা দিতে থাকলো। এতোক্ষনে প্রতিবেশী বুঝতে পারলো সে ভুলে নিজের বাড়ীর হাড়ি ভাঙ্গছে। সে গোপালকে ধন্যবাদ দিলো তার ভুল ভাঙ্গানোর জন্যে।

২১. বুদ্ধিমান গোপাল
একদিন রাজা কৃষচন্দ্র গোপালের বুদ্ধি পরীক্ষার জন্যে এক ফন্দি আটলেন। রাজা বললেন, “গোপাল, বড় চিন্তায় আছি”।

গোপাল জিজ্ঞেস করলো, “মহারাজ, কিসের চিন্তা আপনাকে ভাবনায় ফেলেছে?”

রাজা বললেন, “সত্য ও মিথ্যার মাঝে দূরত্ব কতটুকু তা ভেবে পাচ্ছিনা। তুমি কি এ ব্যাপারে কোন সাহায্য করতে পারে?”

গোপাল বললো, “ এ আবার তেমন কঠিন ভাবনার কথা হলো! চোখ ও কানের মাঝে যে দুরত্ব, সত্য ও মিথ্যার মাঝেও সেই দুরত্ব”।

রাজা গোপালের কথার মানে বুঝতে না পেরে বিশ্লেষন দাবী করলেন।

গোপাল বললো, “ মহারাজ, যা কানে শুনবেন তা যদি চাক্ষুষ প্রমান করতে পারেন, তাহলে সেটাই হবে সত্যি। আর যা কানে শুনবেন কিন্তু চাক্ষুষ প্রমান নেননি, সেটা সত্যি বলে ধরে নিবেন না। তাহলে দেখা যায় সত্য-মিথ্যার সাথে চোখ-কানের একটা শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। সেজন্যে বলেছি চোখ-কানের মাঝে যে দুরত্ব, সত্য-মিথ্যার মাঝে সেই দুরত্ব”।

রাজা কৃষচন্দ্র বুঝতে পারলেন গোপাল শুধু ভাঁড় নয়, বুদ্ধিমানও বটে।

২২. গোপাল ভাঁড় (গোপালের পুত্র)
গোপাল আজকাল মাঝে মাঝে তার ছেলেকে নিয়ে রাজসভায় যায়। সেদিনও গিয়েছে। মহারাজ গোপালের ছেলেকে দেখে রসিকতা করার লোভ আর সামলাতে পারলেন।

তিনি যেন জানেন না এমনি ভাব করে বললেন, "গোপাল, এটি তোমার কে?"

গোপাল বলল, "মহারাজ, মনে হচ্ছে আপনি একে পূর্বে কখনো দেখেননি, এটি আমার ছেলে।"

মহারাজ একটু হেসে বললেন, "সে কী গোপাল! এ যে অনেকটা আমার মতো দেখতে হয়েছে?"

গোপাল সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, "হবে না কেন মহারাজ? নরাণাং মাতুলঃ ক্রমঃ।"

একথা শুনে মহারাজের মুখের কথা ফুরিয়ে গেল।

২৩. গোপাল ভাঁড় (কোনটা হাতি?)
গোপাল তখন খুব ছোট। হাতি দেখাতে গোপালের মা গোপালকে নিয়ে রাস্তার পাশে এসে দাড়িয়েছে। পথ দিয়ে একজন জমিদার হাতির পিঠে চেপে যাচ্ছিলেন।

গোপালের মা গোপালকে বললেন, "ওই দেখ গোপাল হাতি যাচ্ছে"।

গোপাল বলল, "কোনটা হাতি মা, যে চেপে বসে আছে।"

আসলে জমিদারবাবু ছিলেন খুবই মোটা। গোপালের ওই কথা শুনে আশেপাশের লোকজনরা হা হা করে হাসতে থাকল।

২৪. গোপাল ভাঁড় কুকুর কার?
মন্দিরে ঢুকতে যাবার সময় পেছন থেকে পন্ডিতের বাঁধা, ‘এ তুমি কী করছো গোপাল! মন্দিরে কুকুর নিয়ে ঢুকছো?’

‘কোথায় কুকুর?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে গোপাল।

‘এই তো তোমার পেছনে!’ একটি কুকুরের দিকে হাত তুলে দেখায় পন্ডিত।

‘এটি আমার কুকুর নয়!’

‘তোমার নয় বললেই হলো?’ রাগ দেখিয়ে বলে পন্ডিত,

‘তোমার পেছন পেছনেই তো যাচ্ছে!’

‘বটে? তা তুমিও তো আমার পেছন পেছন আসছো!’

২৫. গোপালের দান
ঈশ্বরের সেবা একজন বৈরাগী গোপালকে চিনত না। সে গোপালের সামনে এসে বলল, “ঈশ্বরের সেবার জন্য আপনি কিছু চাঁদা দেবেন?” গোপাল কিছু না বলে বৈরাগীকে একটা টাকা দিল। টাকাটা পেয়ে বৈরাগী খুশি হয়ে পথ হাঁটতে লাগল। কিছুটা যেতেই গোপাল তাকে ডাকল,

“ও বৈরাগী, একবারটি আমার কাছে এসো।”

বৈরাগী খুশিমনে তার কাছে আসলে গোপাল বলল, “তোমার বয়স কত?”

“আঠারো আজ্ঞে।”

“আমার বয়স পঞ্চান্ন।”

“তাতে কি হল?”

“এইমাত্র ঈশ্বরের সেবার জন্য যে একটা টাকা নিয়েছ সেটা ফেরত দাও, কারণ তোমার আগেই আমি স্বর্গে যাব এবং ঈশ্বরের সেবার সুবর্ণ সুযোগ পাব।”

২৬. কাশীতে মৃত্যু
গোপালের জ্যোতিষ চর্চার খ্যাতি শুনে দূর গ্রাম থেকে হাত দেখাতে এসেছেন এক ভদ্রলোক। গোপাল খুব ঘটা করে হাত-টাত দেখে বলে, ‘আপনি তো অতি ভাগ্যবান মশাই! হাতে স্পষ্ট দেখছি আপনার দেহাবসান হবে কাশীতে।’ পূণ্যস্থানে মৃত্যু হবে জেনে ভদ্রলোক খুব খুশি মনে ফিরে গেলেন। কিছুদিন যেতে না যেতেই ভদ্রলোকের ছেলে এসে উপস্থিত। সে তেড়েফুঁড়ে গোপালকে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি গননা করে বলেছিলেন বাবার মৃত্যু হবে কাশীতে। কই, উনি তো বাড়িতেই মারা গেলেন?’ গোপাল আমতা আমতা করে বলে, ‘আমি কি তাই বলেছি নাকি? আমি বলতে চেয়েছি উনি কাশতে কাশতে মারা যাবেন। তা সেটা ঠিক বলেছি কি-না? বলুন?’
২৭. গোপালের উপবাস
গোপাল তখন ছোট। গুরুদেবের সাথে থেকে দীক্ষা নিচ্ছে। কোনো এক একাদশীর দিন গোপাল দেখে উপবাস শেষে গুরুদেব ষোলো প্রকারের পদ দিয়ে সেই রকমের ভোজ দিচ্ছেন। গুরুদেবের খাবারের বহর দেখে গোপাল ঠিক করে ফেলে আগামীবার গুরুদেবের সাথে উপবাস দিতে হবে।

উপবাসের অজুহাতে যদি ষোলো পদের ভোজ পাওয়া যায় তবে কষ্টের চেয়ে লাভই বেশি! সেই পরিকল্পনা মতো সামনের একাদশীতে গোপালও গুরুদেবের সাথে উপবাস করে বসে রইলো। কিন্তু বেলা গড়িয়ে যায় গুরুদেব আর জলযোগে যান না! শেষ-মেষ ক্ষুধার জ্বালায় আর থাকতে না পেরে গোপাল জিজ্ঞেসই করে বসে, ‘গুরুদেব, বেলা হয়ে গেলো, জলযোগ করবেন না?’

গুরুদেব স্মিত হেসে বলেন, ‘ওরে আহাম্মক, আজ যে ভীম একাদশী… নিরম্বু উপবাস।’

২৮. চেহারায় মিল
রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সব সভাসদদের সামনে গোপালকে জব্দ করার উদ্দেশ্যে বলছেন, ‘বুঝলে গোপাল, আমার সাথে তোমার চেহারার কিন্তু দারুণ মিল! তা বাবার শাসনামলে তোমার মা কি এদিকে আসতেন-টাসতেন নাকি?’

গদগদ হয়ে গোপাল বলে, ‘আজ্ঞে না রাজামশাই! তবে মা না এলেও বাবা কিন্তু প্রায়শই আসতেন!’

২৯. তামাক আর গাধা
গোপালের তামাকপ্রীতি রাজা কৃষ্ণচন্দ্র মোটেই পছন্দ করতেন না। একদিন গোপালকে সঙ্গে নিয়ে পালকিতে কোথাও যাচ্ছেন, দেখেন তামাক ক্ষেতে এক গাধা চড়ে বেড়াচ্ছে। সেই গাধা ক্ষেতের আগাছা খাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তামাক পাতায় ভুলেও মুখ দিচ্ছে না।

সুযোগ পেয়ে রাজা বলেন, ‘দেখেছো হে গোপাল, একটা গাধাও তামাক খায় না!’

শুনে গোপাল বলে, ‘আজ্ঞে রাজা মশাই, তা যা বলেছেন। কেবল গাধারাই তামাক খায় না

৩০. এবার তুমি আসতে পার...
এক সকালে গোপাল বাড়ির ভেতরে একটি জরুরী কাজে ব্যস্ত। এক ভিক্ষুক সদর-দরজায় দাঁড়িয়ে চেঁচাতে লাগল-‘গোপাল বাবু একবারটি শুনে যান তো, একবারটি শুনে যান।

গোপাল হাতের কাজ ফেলে ব্যস্তপায়ে ভিক্ষুকটির কাছে আসতেই সে বলল-‘কিছু ভিক্ষা চাইছি।’

গোপাল ভ্রুকুঁচকে বলল-‘একথা বলার জন্য আমাকে ডেকে আনলে। হাতের কাজ ফেলে ছুটে আসতে হল-’

ভিক্ষুকটি নিতান্ত অপরাধীর মত করুন স্বরে নিবেদন করল-‘কিছু মনে করবেন না, মাফ চাইছি। আসলে চেঁচিয়ে ভিক্ষা চাইতে লজ্জা।–’

তার মুখের কথা শেষ হবার আগেই গোপাল বলল-‘বুঝলাম, এসো, ভিতরে এসো।’

ভিক্ষুকটি তার পিছন পিছন এগিয়ে গিয়ে উঠোনে দাঁড়াল। গোপাল ঘরে ঢুকে গেল। বেশ কিছুক্ষণ বাদে ঘর থেকে বেরিয়ে বলল-‘তুমি এখন আসতে পার হে। ভিক্ষে দেয়া যাবে না।’

রাজা গোপাল ভাড়ঁ কে প্রশ্ন করল, গাধা আর তোমার মধ্যে ব্যবধান কতটুকু? গোপাল রাজা থেকে নিজের দুরত্ব টা মেপে তারপর জবাব নিজেরদিল, বেশি না ; মাত্র সাড়ে চার হাত ব্যবধান!

৩১. উলটো হলে বাবু
গোপাল একটা নতুন ঘোড়া কিনেছে। গোপাল তাই নিজে সখ করে তার সাজ পরাতে গিয়েছে। নিজের পছন্দমত কোনমতে সাজ এঁটে দেওয়ার পর, একটা চাকর বলে উঠলো।

বাবু সাজ উলটো হলো যে। গোপালের নিজের মনেও সন্দেহ হচ্ছিল যে, তার হয়তো সাজ পরানো ঠিক হয়নি। কিন্তু তাই বলে চাকরে ভুল ধরবে? এ হতেই পারে না।

তিনি চটে বললেন কেন? উলটো হবে কেন রে বোকা?

চাকর বললে, এ দিকটা থাকবে আপনার মুখের দিকে ও দিকটা থাকবে পিঠের দিকে। তাহলেই ঠিক হবে বাবু।

গোপাল ধমকে বলল ব্যাটা ফাজিল মূর্খ। তুই কী করে জানলি, আমি কোন দিকে মুখ করে বসবো তুই যেন সবজান্তা হয়ে বসে আছিস্? গোপাল কোনমতে ছোট হতে পারছিল না।

৩২. পরকাল খাওয়া
একদিন ঘোর বর্ষার সময় গোপাল জুতো হাতে পথ চলেছে। এমন সময় পাল্কী চড়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ওই পথে যাচ্ছিলেন। তিনি গোপালকে দেখে পাল্কী থেকে নেমে এলেন। আর গোপালের জুতোর দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, কি গোপাল! পরকাল যে হাতে করে চলেছো? কী ব্যাপার তোমার?

গোপাল বললে, আমি তবু হাতে রেখেছি, আপনি যে খেয়ে বসে আছেন।

রাজা কৃত্রিম রোষে বললেন, তুমি আমাকে জুতো খোর বলছো? জান এর শাস্তি কি?

গোপাল কিছুমাত্র ভয় না পেয়ে বললে, আজ্ঞে না হুজুর না বললে কি করে জানব। তুব বলি জোয়ান মানুষ আপনি, পাল্কী ছাড়া চলতে পারেন না। এতেও কি আপনি বলতে চান– আপনি নিজের পরকাল খেয়ে বসেননি বা আমি মিথ্যা বলেছি?

মহারাজ এদিকটা চিন্তা করেন নি। যখন ভুল বুঝতে পারলেন তখন না হেসে পারলেন না যে গোপাল ঠিক কথাই বলেছে।

৩৩. বিদ্যার জাহাজ
গোপাল ভাঁড়ের গল্প জাহাজ একবার কোনো কারণে গোপাল ভাঁড়ের খুব মেজাজ খারাপ। নদীর ধার দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরছিল। পথে দুই লোক তাকে আটকাল।

একজন আরেকজনকে দেখিয়ে বলল, ওনাকে চেনো, গোপাল? —না। —আরে, উনি বিদ্যার জাহাজ...তোমার মতো গবেট নন। শুনে গোপাল ওই বিদ্যার জাহাজ লোকটাকে ঠেলে নদীতে ফেলে দিয়ে ফের হাঁটা দিল।

‘এ কী করলে তুমি?’ হায় হায় করে উঠল লোকটা!

—জাহাজটাকে নদীতে ভাসিয়ে দিলাম আর কি।

৩৪. উটকো লোক
গোপাল একবার এক বড় মেলায় বেড়াতে গিয়েছিল। মেলায় গোপাল মেজাজে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এমন সময় একটা উটকো লোক এসে গোপালকি জড়িয়ে ধরলো আচ্ছা দাদা কাশিতে মরলে লোক স্বর্গে যায় আর ব্যাস কাশীতে মরলে নাকি গাধা হয়। কিন্তু যারা কাশি ও ব্যাসকাশীর ঠিক মাঝখানে মরে, তারা কি হয়? আপনি বলতে পারেন দাদা আমার জানতে ইচ্ছে?

গোপাল বললে- মশায়, তারা আপনার মতো উটকো হয়। কথা নেই বার্তা নাই চেনা নাই শুনা নাই…. দুম করে জড়িয়ে ধরে প্রশ্ন। একে বলে উটকো লোক।

.৩৫ গোপালের মোড়ল হওয়া
গোপাল একবার গ্রামের মোড়ল হয়েছিল। তো একদিন ভোরবেলায় এক লোক এসে ডাকতে লাগল, ‘গোপাল? গোপাল?’

গোপাল ভাঁড় কোনো উত্তর না দিয়ে শুয়েই রইল। এবার লোকটা চিৎকার করে ডাকতে লাগল, ‘মোড়ল সাহেব, মোড়ল সাহেব।’

এবারও গোপাল কোনো কথা না বলে মটকা মেরে শুয়ে রইল।

গোপালের বউ ছুটে এসে বলল, ‘কী ব্যাপার, লোকটা মোড়ল সাহেব মোড়ল সাহেব বলে চেঁচিয়ে পড়া মাত করছে, তুমি কিছুই বলছ না!’

গোপাল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘আহা, ডাকুক না কিছুক্ষণ, পাড়ার লোকজন জানুক আমি মোড়ল হয়েছি।’

৩৬. গোপালের ভূত তাড়ানো
বেড়াতে বেরিয়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র একবার গোপালের হাত চেপে ধরে আস্তে আস্তে মোচড়াতে লাগলেন। গোপাল: আমার হাত নির্দোষ, ওকে রেহাই দিন। রাজা: জোর করে ছাড়িয়ে নাও।

গোপাল: সেটা বেয়াদবি হবে। রাজা: উহু, তাহলে হাত ছাড়ব না। গোপাল তখন যে রোগের যে দাওয়াই বলে রাম নাম জপতে থাকলেন।

রাজা: এতে কি আর কাজ হবে? দাওয়াই কোথায়? গোপাল: রাম নাম জপাই তো মোক্ষম দাওয়াই।

রাজা: মানে?

গোপাল: পিতামহ, প্রপিতামহের আমল থেকে শুনে আসছি, রাম নাম জপলে ভূত ছাড়ে।

রাজা গোপালের হাত ছেড়ে দিলেন সঙ্গে সঙ্গে।

৩৭. হাটে গাই, পায়েস খাই
হাটে গাই, পায়েস খাই গোপাল ভাঁড়ের ভাইপো আর তার স্ত্রীর মধ্যে ভীষণ ঝগড়া বেধেছে।

মধ্যস্থতা করতে এগিয়ে গেলেন গোপাল। বললেন, ‘বলি কী নিয়ে এত ঝগড়া হচ্ছে শুনি?’

গোপালের ভাইপো বলল, ‘দেখুন তো কাকা, আমি আগামী বছর একটা দুধেল গাই কিনব বলেছি। আর আমার স্ত্রী বলছে, সে নাকি গাইয়ের দুধ দিয়ে পায়েস রাঁধবে।’

ভাইপোর স্ত্রীও সমান তেজে চেঁচিয়ে উঠল। দু হাত তুলে দুজনকে থামতে ইঙ্গিত করে বললেন গোপাল, ‘আস্তে আস্তে! গাধা নাকি তোরা?’

দুজন একটু ঠান্ডা হলে গোপাল ভাইপোকে বললেন, ‘আরে গাধা, তোর বউয়ের পায়েস রাঁধা তো পরের কথা। আমি যে বাড়ির পেছনে সবজির বাগান করেছি, সেসব যে তোর গরু খাবে, সে খেয়াল আছে?

৩৮. ব্যবসা মাটি করবো না
গোপাল ভাঁড় একদা খেয়া নৌকা করে পারে আসছিল। তোড়ে জোয়ার আসার সময় গোপাল খেয়া নৌকা থেকে জলে পড়ে গেল মাঝনদীতে। পড়েই নাকানি চোবানি খেতে লাগল। ভীষণ স্রোত, তাই কেউ তাকে তোলবার জন্যে, জলে ঝাঁপ দিতে সাহস করল না।

একখানা ডিঙ্গি আসছিল পাল তুলে, তা থেকে মদন মাঝি, দেখতে পেয়ে লাফ দেয় পড়ে গোপালকে টেনে তুলল তার ডিঙ্গিতে। আগে চিনতে পারেনি, এখন দেখলে, তার মহাজন গোপাল ভাঁড়কে সে বাঁচিয়েছে।

গোপালের কাছে মদন মাঝি কিছু টাকা দেনা করেছিল। আশা হলো, তাহলে দলিলখানা হয়তো গোপাল অমনি অমনি ফেরত দিতে পারে। মদন মাঝি এই আশায়ই মনে মনে ফাঁদছিল। কিন্তু গোপালের প্রথম কথাতেই সে নিরাশ হলো।

গোপাল বলল, তুমি আমায় বাঁচিয়েছো মদন। আমিও দরকার হলে তোমার জন্য প্রাণ দেব। কিন্তু তা বলে সুদ ছাড়তে দিয়ে ব্যবসা কখনো মাটি দেব না। গোপালের প্রাঞ্জল কথা শুনেই মদন সরকারের প্রাণ জল, তার আশার গুড়েবালি।

হায়রে! আসল ছাড় তো দুরস্থান সুদের ঠ্যালাতেই মদনের লবেজান। পরে গোপাল তার দলিল ফেরৎ দিয়েছিল।

৩৯. গোপালের স্ত্রীর পরীক্ষা
রাজা রামচন্দ্র : গোপাল তোমার মত একজন এমন রসিক মানুষের একজন যোগ্য রসিক স্ত্রী হওয়া উচিত ছিল, নয় কি?

গোপাল : ভগবানের কাজের উপরতো আমার হাত নেই, তবে তিনি মনে হয় আমায় খুব ঠকাননি।

রাজা : তবে তো পরীক্ষা করে দেখতে হয়, কি বল?

গোপাল : সে আপনার মর্জি। পরের দিন গোপালের অনুপস্থিতিতে গোপালের বাড়ীতে রাজা একজন সেপাহি পাঠালেন (উদ্দেশ্য নিয়ে)।

সেপাহি : গোপাল বাবু, ও বাবু গোপাল।

ভেতর বাড়ী থেকে নারী কন্ঠ : উনি বাড়ি নেই, রাজ সভায় গেছেন।

সেপাহি : আপনি কে?

নারী কন্ঠ : আমি উনার স্ত্রী।

সেপাহি : রাজা আপনার কাছে ২টি ডালিম চেয়ে পাঠিয়েছেন।

কিছুক্ষন পরে গোপালের স্ত্রী ২টি ডালিম প্রহরির হাতে দিল।

সেপাহি : একি ১টা যে কাঁচা।

গোপালের স্ত্রী : রাজাকে বলো ১টা খেতে ১টা খুঁটতে।

রাজসভায় গিয়ে সেপাহি ডালিম ২টি রাজার হাতে দিল।

রাজা : সেপাহি তুমি কি দেখে আনোনি ১টি ডালিম কাঁচা যে।

সেপাহি : আমি দেখেই এনেছি, উনি বলে দিয়েছে, '১টা খেতে ১টা খুঁটতে'।

রাজা : গোপাল তোমার স্ত্রী সত্যিই তোমার উপযুক্ত।

৪০. গোপাল ভাঁড়ের বিচার
নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ছোটরানী কাঁদতে কাঁদতে উষ্ঠাগত প্রানে গিয়ে রাজাকে নালিশ জানালেন-'মহারাজা আপনার সভার প্রধান ভাঁড় গোপাল আমাকে 'চুতমারানী' ডেকেছে ।

রাজা ক্ষেপে উঠে হুকুম দিতে যতো সময় নিলেন তাঁরসিপাই সান্ত্রী তারো আগে গোপালকে ধরে বেঁধে নিয়ে এলো রাজদরবারে । রাজা দিলেন হুকুম প্রানদণ্ডের ।

আদরের রানীকে এতো জঘন্য গালি! প্রানদন্ড তো তবু লঘু শাস্তি...

গোপাল কাঁচুমাচু হয়ে বলে -মহারাজ প্রানদণ্ড দেবেন দিন । আপনার দয়ার শরীর,একবার শুধু এই অভাগার কথা শুনুন'

মহারাজার দয়া হলে গোপাল ইনিয়ে বিনিয়ে বলে- 'যাচ্ছিলাম রাজবাড়ীর সামনে দিয়ে, হাতে ছিলো ফুল । ছোটরানী ডেকে বললেন-'গোপাল ফুলের নাম কি?' ফুলের নাম চুতফুল । রানী মাকে তাই উত্তর দিলাম 'চুত-মা-রানী'

গোপালের আদব লেহাজে মুগ্ধ হয়ে রাজামশাই তার প্রানদন্ড মওকুফ করলেন,রানীমাতা অজস্র স্বর্নমুদ্রা উপঢৌকন দিলেন,চারদিকে ধন্য ধন্য রব উঠলো

৪১. নবাবের ইচ্ছা
গোপাল যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ি। মাথার ওপর গনগনে সূর্য। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে গোপাল এক গাছের নিচে বিশ্রাম নিতে বসল। বেশি গরম লাগায় ফতুয়াটা খুলে পাশে রেখে একটু আয়েশ করে বসল। বসে বিশ্রাম নিতে নিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল, নিজেই জানে না।

ঘুম যখন ভাঙল গোপাল দেখে, তার ফতুয়াটা চুরি হয়ে গেছে। হায় হায়! এখন কী হবে! খালি গায়ে তো আর শ্বশুরবাড়ি ওঠা যায় না। কী আর করা।

সে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে বলতে লাগল, ‘হে ভগবান, রাস্তায় অন্তত ১০টি মুদ্রা যেন কুড়িয়ে পাই, তাহলে পাঁচ মুদ্রায় আমার জন্য একটা ভালো ফতুয়া কিনতে পারি। আর তোমার জন্য পাঁচটি মুদ্রা মন্দিরে দান করতে পারি···।’

আর কী আশ্চর্য! ভাবতে ভাবতেই দেখে, রাস্তার ধারে কয়েকটি মুদ্রা পড়ে আছে। খুশি হয়ে উঠল গোপাল, গুনে দেখে পাঁচটি মুদ্রা! গোপাল স্বগত বলে উঠল, ‘হে ভগবান, আমাকে তোমার বিশ্বাস হলো না, নিজের ভাগটা আগেই রেখে দিলে?

৪২. গোপালের জব্দ
ছোটবেলা গোপাল ভাঁড় কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলে বুড়োরা তাকে ক্ষেপাত আর হাসত,
‘গোপাল, এর পর তোমার পালা।’
শুনে গোপালের খুব রাগ হত। বুড়োদের কিভাবে জব্দ করা যায়, সেই পথ খুঁজতে লাগল এবং এক সময় পেয়ে গেল। শবদাহ আর শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে গিয়ে ঐসব বুড়োদের বলতে লাগল,
‘এর পর তোমার পালা!’

৪৩. সোজা-সাপ্টা উত্তর
গোপালকে বলছেন রামবাবু, ‘এখানে বাঁদরের বড্ড উৎপাত। তোমাকে তো দেখতে বেশ বাঁদরের মতোই! ওদের দলে তোমাকে ছেড়ে দিলে কি হবে বলতো? তুমি নিশ্চই কখনো বাঁদর দেখনি?’
‘আজ্ঞে না! আপনার মত বাঁদর আমি আগে আর কক্ষনো দেখিনি!’ গোপালের সোজা-সাপ্টা উত্তর।

৪৪. গোপালের চিঠি লেখা
গোপাল লেখাপড়া বিশেষ কিছু জানত না। যদি বা লেখাপাড় কিছু জানত কিন্তু হাতের লেখা ছিল খুব খারাপ। কিন্তু রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ভাঁড় হিসাবে তার খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। পাড়া পড়শীরা তাই তাকে সমীহ করে চলত- কেউ কেউ বা বিভিন্ন প্রয়োজনে গোপালের সঙ্গে এসে দেখা করত পরামর্শ নিত, গোপালের বুদ্ধি নিয়ে প্রায় সকলে চলত ।

একদিন এক বুড়ি এসে বলল, গোপাল ভাই, আমার একখানা চিঠি লিখে দাও না। আমার নছেলে পুরী থেকে দশক্রোশ দূরে নাগেশ্বরপুর গেছে। কোনও খবর পাচ্ছিনে বেশ কয়েকদিন হল। টাকা পয়সাও নাই যে কাউবে পাঠাব।

বুড়ির কথা শুনে গোপাল বললে, আজ তো আমি চিঠি লিখতে পারব না ঠাকমা।

কেন ভাই, আজ কি যে, তুমি চিঠি লিখতে পারবে না। অনেকদিন হয়ে গেছে আজ না লিখলেও নয়। আর তোমার দেখা সব সময়পাই না যে তোমাকে চিঠি লিখতে বলি। আজ দেখা পেয়েছি, একখানা চিঠি লিখে দাও না ভাই? আমি বুড়ো মানুষ কার কাছে যাব চিঠি লিখতে ভাই, তুমিই একমাত্র ভরসা।

আমার যে পায়ে ব্যাথ্যা গো ঠাকমা।

পায়ে ব্যথা তাতে কি হয়েছে? চিঠি লিখবে তো হাত দিয়ে? পায়ে কি তুমি চিঠি লিখবে নাকি। তোমার কথা শুনলে হাসি পায়। তোমার মত এমন কথা কোথাও শুনিনি।

গোপাল হেসে বলল, চিঠি তো লিখব হাত দিয়েই। কিন্তু আমার চিঠি অন্য কেউ যে পড়তে পারবে না। আমার লেকা চিঠি আমাকে নিজে গিয়ে পড়েদিয়ে আসতে হবে। আমার যে এখন পায়ে ব্যথা। এখান থেকে পুরী আবার পুরী থেকে দশ ক্রোশ দূরে নাগেশ্বরপুরে চিঠিটা তো আমি পুড়ে দিয়ে আসতে পারব না। তুমি অন্য কাউকে দিয়ে চিঠিখানা এবারকার মতো লিখিয়ে নাও, ঠাকমা। আমার পা ভাল হলে চিঠি লিখে দেব এবং নিজে দিয়ে পড়ে আসব।

বুড়ি মা এর পর আর কি বলবে। বাধ্য হয়ে চিঠি না লিখিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হল গোপালের বাড়ি থেকে।

৪৫. রাজার স্বপ্ন
আর রাজা গোপালভাঁড়কে বলেছিলেন, 'আজ স্বপ্নে দেখলাম আমি ক্ষীরের সাগরে অবগাহন করছি আর তুমি পড়েছো বিষ্ঠার সাগরে' বলেই দমফাঁটা হাসি।

গোপালভাঁড় বললো, 'হে রাজন! আমি কিন্তু স্বপ্নের শেষাংশ দেখেছি! দেখলাম আমি আপনার গা জিহ্বা দিয়ে চেটে সাফ করে দিচ্চি আর আপনি আমারটা'।

একথা শুনে রাজার বুমির উপক্রম হল এবং গোপালকে উপহার দিয়ে বিদায় করে দিলেন।

৪৬. চোরের আজব সাজা
একদিন গোপালের জ্বর হওয়ায় সে সেদিন রাজসভায় যেতে পারেনি। মহারাজ সভা সদদের নিয়ে নানা আলাপ আলোচনা করতে করত বললেন, আমার সভার মধ্যে এমন কি কেউ আছে, যে গোপালের ঘর থেকে কিছু চুরি করে আনতে পারে?

যদি কেউ পারে, তবে সে সামান্য জিনিস হলেও আমি তাকে বিশেষভা করব। তোমরা কেউ রাজী থাকলে বল। মহারাজের পুরষ্কার লোভেও কেউ রাজি হল না গোপালের ঘরে চুরি করতে। কারণ বড় চতুর সে।

তার চোখে ধুলো দেওয়া সহজ নয়। ধরা পড়লে নাকালের শেষ থাকবে না। নাকানি চোবানি তো খে আর সে তার প্রতিশোধ একদিন না একদিন নেবেই নেবে এবং অশেষ দুর্গতির সীমা থাকবে না।

ভূপাল নামে একটি লোক পুরষ্কারের লোভে সেদিন মধ্যরাত্রে গোপালের বাড়িতে সিদ কেটে প্রবেশ করল। গোপাল আগে থেকেই রাজসভার কথা জানতে পেরেছিল, তাই সে লোভি লোকটাকে সাইজ করার জন্য তৈরি হয়ে রইল।

গোপালের ঘরের দেওয়ালে সিদ। গোপাল পূর্ব প্রস্তুতি মতো একটা ম বিষ্ঠাপূর্ণ কলসির উপরে গোটাকতক টাকা রেখে দিয়েছিল এবং সেখানে নিজে এক গোপন করে দাঁড়িয়ে রইল।

লোকটি সিদ কেটে যখন ঘরের মধ্যে মাথা গলিয়ে ঢুকে যে, সামনেই একটা টাকা ভর্তি কল সে আরকালবিলম্ব না করে তাই মাথায় তুলে নিয়ে মনের আনন্দে রাজবাড়িরে দিকে গোপাল ঢিল

ছুঁড়ে ব্রাহ্মণের মাথার কলসীটা ভেঙে দিল। কলসী চুরমার হয়ে সঙ্গে সঙ্গে লোক সারা শরীর বিষ্ঠাতে পূর্ণ হয়ে গেল। তখন ভোর হয়েছে। গোপাল বেরিয়ে বলল, কি বাবা চুরি করা হল। মহারাজ পরে গোপালের মুখে এসব কথা শুনে বেশ আনন্দিত হলেন।

৪৭. ঘোড়া নয়, গাধা দরকার
গোপালের গ্রামে এক ধোপা বাস করত। সে খুবই বোকা। তার একটা ঘোড়া ছিল। কিন্তু ঘোড়ার দ্বারা কাপড় কেচে বাড়ি বাড়ি দেওয় যায়না। তার একটা গাধার দরকার। ঘোড়া বিক্রি করে সেই টাকায় গাধা ভাল রকম কিনে আনতে পারে- সে এ কথাটা ভাবতে পারে না। এমনই তরল তার মগজের ঘিলু।

গোপাল অনেক কাজ সমাধা করে দিতে পারে লোকের মুখে শুনে সে গোপালকে গিয়ে ধরল, গোপাল দাদা, গোপাল দাদা, আমার এই ঘোড়ার দরকারনেই, একে গাধা বানিয়ে দাও। তুমি নাকি লোকে বলে সব পার।

গোপাল হেসে বললে, ব্যাটা তোমার মত গাধাকে পিটিয়ে বরং ঘোড়া বানানো যায়, ঘোড়া পিটিয়ে গাধা তৈরী করা যায় না আদপেই।

৪৮. শীতের রাতে
রাজা বললেন, শীতের রাতে কেউ কি সারা রাত এই পুকুরে গলা জলে ডুবে থাকতে পারবে? যদি কেউ পারে, আমি তাকে অনেক টাকাপয়সা, ধনরত্ন পুরস্কার দেব।

এক ছিল গরিব দুঃখী মানুষ। সে বলল, আমি পারব।

সে মাঘ মাসের তীব্র শীতে সারা রাত পুকুরের জলে গলা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ভোরের বেলা সে উঠল জল থেকে।

রাজার কাছে গিয়ে সে বলল, আমি সারা রাত পুকুরের জলে ছিলাম। আপনার সান্ত্রী-সেপাই সাক্ষী। এবার আমার পুরস্কার দিন।

রাজা বললেন, সেকি, তুমি কেমন করে এটা পারলে!

গরিব লোকটা বলল, আমি জলে সারা রাত দাঁড়িয়ে রইলাম। দূরে,অনেক দূরে এক গৃহস্থবাড়িতে আলো জ্বলছে। আমি সেই দিকে তাকিয়ে রইলাম। সারা রাত কেটে গেল।

মন্ত্রী বলল, পাওয়া গেছে। এই যে দূরের প্রদীপের আলোর দিকে ও তাকিয়ে ছিল, ওই প্রদীপ থেকে তাপ এসে তার গায়ে লেগেছে। তাই তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে এই শীতেও ওই পুকুরে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে রেখে দাঁড়িয়ে থাকা।

রাজা বললেন, তাই তো! তাহলে তো তুমি আর পুরস্কার পাও না। যাও। বিদায় হও।

গরিব লোকটা কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নিল। সে গেল গোপাল ভাঁড়ের কাছে। অনুযোগ জানাল তাঁর কাছে। সব শুনলেন গোপাল ভাঁড়।

তারপর গোপাল ভাঁড় বললেন, ঠিক আছে, তুমি ন্যায়বিচার পাবে।

গোপাল ভাঁড় নিমন্ত্রণ করলেন রাজাকে। দুপুরে খাওয়াবেন। রাজা এলেন গোপাল ভাঁড়ের বাড়ি। গোপাল ভাঁড় বললেন,

আসুন আসুন। আর সামান্যই আছে রান্নার বাকি। কী রাঁধছি দেখবেন, চলুন।

গোপাল ভাঁড় রাজাকে নিয়ে গেলেন বাড়ির পেছনে। সেখানে একটা তালগাছের ওপর একটা হাঁড়ি বাঁধা আর নিচে একটা আগুন জ্বালানো।

গোপাল ভাঁড় বললেন, ওই যে হাঁড়ি, ওটাতে জল, চাল, ডাল, নুন সব দেওয়া আছে। এই তো খিচুড়ি হয়ে এল বলে। শিগগিরই আপনাদের গরম গরম খিচুড়ি খাওয়াচ্ছি।

রাজা বললেন, তোমার বাড়িতে নিমন্ত্রণ খাব বলে সকাল থেকে তেমন কিছু খাইনি। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। এখন এই রসিকতা ভালো লাগে!

রসিকতা কেন, রান্না হয়ে এল বলে।

রাজা বললেন, তোমার ওই খিচুড়ি জীবনেও হবে না, আমার আর খাওয়াও হবে না। চলো মন্ত্রী, ফিরে যাই।

গোপাল বললেন, মহারাজ, কেন খিচুড়ি হবে না। দূরে গৃহস্থবাড়িতে জ্বালানো প্রদীপের আলো যদি পুকুরের জলে ডুবে থাকা গরিব প্রজার গায়ে তাপ দিতে পারে, এই প্রদীপ তো হাঁড়ির অনেক কাছে। নিশ্চয়ই খিচুড়ি হবে।

রাজা তার ভুল বুঝতে পারলেন। বললেন, আচ্ছা পাঠিয়ে দিয়ো তোমার ওই গরিব প্রজাকে। ওর প্রতি আসলেই অন্যায় করা হয়েছে। ওকে দুগুন পুরস্কার দেব।

সে তো আপনি দেবেনই। আমি জানতাম। আসুন, ঘরে আসুন। দুপুরের খাওয়া প্রস্তুত।

তারপর রাজা সত্যি সত্যি গরিব লোকটাকে অনেক পুরস্কার দিয়েছিলেন।

৪৯. অনামুখো কে?
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র অনামুখোদের একদম পছন্দ করতেন না। একদিন রাতে গোপালের পক্ষে বাড়ি ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কারন গানের জলসা শুনতে শুনতে অনেক রাত হয়েছিল। তাই সেদিন বাধ্য হয়ে তাকে রাজবাড়ির অতিথিশালায় থাকতে হয়েছিল।

পরদিন ভোরে মহারাজ ঘুম থেকে উঠে অতিথিশালার বারান্দায় গোপালকে প্রথম দেখলেন, গোপালও মহারাজকে দেখে তাঁকে নমস্কার করল।

কিন্তু সেদিন নাপিতের কাছে নখ কাটতে যেতেই, রাজার কড়ে আঙ্গুলের খানিকটা মাংস কেটে গেল।

নাপিত বলল,- হুজুর, এত বছর ধরে আপনার নখ দাড়ি ও চুল কাটছি,-কই, একদিনও তো একটু আঁচড় লাগেনি-আজ নিশ্চয় আপনি কোন অনামুখোর মুখ দেখেছেন।

রাজা মনে করে দেখলেন, তিনি সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই গোপালের মুখ দেখেছিলেন। রাজরাজড়ার খেয়ালাই আলাদা।

তিনি তক্ষুনি রক্ষী পাঠিয়ে গোপালকে তলব করে আনিয়ে বললেন- তোমার মতো অনামুখো বেঁচে থাকলে বহু লোকের সর্বনাশ ঘটবে-তাই আমি তোমার মৃত্যুদণ্ড দিলাম। আজ ভোরে উঠে তোমার মুখ দেখেছিলাম বলেই আমার কড়ে আঙ্গুল কেটে গেছে।

গোপাল মৃত্যুদণ্ডের আদেশ শুনে কিছুমাত্র বিচলিত না হয়ে বলল- হুজুর, অনামুখোদের চরম দণ্ড দিয়ে ভালই করেছেন। কিন্তু মহারাজ, ঘুম থেকে সবার আগে আপনি আমার মুখ দেখেছেন বলে-আপনার কড়ে আঙ্গুলের সামান্য একটু মাংস কেটে গেছে।

আর ঘুম থেকে উঠে সবার আগে আমি আপনার মুখ দেখে উঠেছি বলে-আজ আমার মৃত্যুদণ্ড হচ্ছে। আপনি এবার বিচার করে বলুন-আমাদের দু’জনের মধ্যে কে বেশী অনামুখো।

সঙ্গে সঙ্গে মহারাজ গোপালের মৃত্যুদণ্ড মকুব করে দিয়ে বললেন- আমি মোটেই অনামুখো নই। দেখলে তো তোমার কিছুই হ’লো না।

৫০. গোপালের ভাইপো
গোপালের ভাইপোও কাকার উপযুক্ত বটে। কেউ কম নয়।

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আর্থিক আনুকূ্ল্যে গোপাল পাকাবাড়ি তুলেছিল। পাকাবাড়ি শেষ হওয়ার পর, গোপাল একদিন তার নূতন তৈরি পাকাবাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে পাশের কুঁড়েঘরবাসী ভাইপোকে বলল- ওরে শামু, বাড়ির ভেতর বসে কি করছিস রে?

গোপালের ভাইপো শামু বাড়িতেই ছিল, সে কাকার প্রশ্নের উত্তর দেবার কোনও প্রয়োজন বোধ করল না। কারণ সে জানত, ভাইপোকে ডাকবার কোন প্রয়োজন কাকার ছিল না,নূতন বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ভাইপোকে ডেকে বাড়িটা দেখাতে চেয়েছিল।

এক বছর পর গোপালের ভাইপো একটা পাকাবাড়ি তৈরি করে, সেই নূতন বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ডাকতে লাগল- ও কাকা, কাকা, গত বছর তুমি আমায় ডেকেছিলে কেন?

গোপাল বসে বসে ভাবল-ভাইপো লায়েক হয়েছে। কাকার মনের কথা ঠিক ধরতে পেরে, ঠিক সময়েই জবাব দিয়েছে বটে!

৫১. কে বেকুব
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র একদিন গোপালকে আদেশ করলেন- আমার রাজ্যে যত বেকুব আছে তাদের একটা তালিকা প্রস্তুত করো।

--যথা আজ্ঞা মহারাজা- বলে গোপাল তালিকা শুরু করে সবার ওপরে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের নাম লিখল।

--আমার নাম সবার ওপরে কেন ? রেগে গিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র জিজ্ঞাসা করলেন।

উত্তরে গোপাল বলল-- যে বেকুব খুঁজতে যায়, সে হল সবচেয়ে বড় বেকুব।

৫২. আবার কবে পুড়বে
একটি আলুর গুদামে কোন কারণবশতঃ আগুন লেগেছিল। আলুর গুদামের মালিক মাথায় হাত দিয়ে বসেছিল। গুদামের অনেক টাকার আলু ছিল যে।

গোপাল সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল, অপর সকলে যখন আগুন নেভাতে ব্যস্ত গোপাল তখন পাশের একটি মুদি দোকান থেকে খানিকটা নুন চেয়ে পোড়া এবং আধ-সেদ্ধ আলুগুলো মনের আনন্দে নুন দিয়ে খেতে লাগল। আলু খেতে খেতে তার পেট ভরে গেল। গুদামের মালিককে এক কোণে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখে গোপাল বলল- মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন কেন দাদা? এটা কি মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকবার সময়?

গুদামের মালিক আফসোস করে বলল- যার যায়, সে-ই বোঝে ভাল। এই আলুর গুদামটা যে আমার।

গোপাল লোকটার আরো কাছে গিয়ে বলল- তাই নাকি দাদা? তবে তো আপনি ঠিক খবর দিতে পারবেন।

-কি খবর?

-আবার কবে আলুর গুদাম পুড়বে দাদা?

৫৩. মধ্যস্থতা
গোপালের ভাইপো আর তার স্ত্রীর মধ্যে ভীষণ ঝগড়া হচ্ছে দেখে গোপাল তাদের থামাতে গেল।

গোপালকে দেখে তার ভাইপো বলতে লাগল, ‘দেখুন তো কাকা, আমি আগামী বছর একটা দুধেল গাই কিনব আর তাই শুনে আমার বউ বলছে, সে নাকি গাইয়ের দুধ দিয়ে পায়েস বানিয়ে তার বাপের বাড়ির গুষ্টিকে খাওয়াবে•••।’

গোপাল হাত তুলে তাদের থামাল। ‘আস্তে’

ভাইপো থামল।

এবার গোপাল ভাঁড় খেঁকিয়ে উঠল, ‘বদমাশ, তোর বউয়ের পায়েস তো পরে.....বাড়ির পিছে আমি যে শাক-সবজির বাগান করেছি, সেগুলো যে তোর গরু খাবে, সে খেয়াল আছে?’

৫৪. সেই কড়াইতেই মাছ ভাজা হতো
একদিন একজন লোক গোপালকে ডেকে বলল- ওহে গোপাল, শোন শোন, এই রকম ছোট কড়াই নিয়ে কোথায় যাচ্ছ? আমার মামার বাড়িতে একটা কড়াই ছিল- তা কড়াইয়ের মত কড়াই বটে। লম্বায় দু’ক্রোশ আর প্রস্থে দু’ক্রোশ। ভেবে দেখ একবার কড়াইয়ের বহর।

লোকটির কথায় গোপাল হেসে ব্তি- ও, এই কথা? তা অত বড় কড়াই হতে পারে বৈকি! আমার দাদু রোজ একটা করে আস্ত ইলিশ মাছ ভাজা খেত।

লোকটি বলল- এ আর এমন কি কথা? একটা গোটা ইলিশ মাছ ভাজা অনেকেই খেতে পারে।

গোপাল বলল- এ তো আর যে সে ইলিশ নয় খুড়ো! লম্বায় দেড় ক্রোশ আর প্রস্থে প্রায় এক ক্রোশ।

গোপালের কথা শুনে লোকটি চোখ বড় বড় করে বলল- বল কি হে গোপাল, অত বড় মাছ! এ যে আমি বাপ-ঠাকুরদার জন্মেও শুনিনি। গুল দেওয়ার আর জায়গা পাওনি? অত বড় মাছ কোন কড়াইতে ভাজত?

গোপাল মুচকি হেসে বলল- কেন, আপনার মামাবাড়ির সেই কড়াই। সেই কড়াইতেই তো মাছ ভাজা হতো।

৫৫. ভূত
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দরবারে রাজবৈদ্য নিয়োগ দেওয়া হবে। দেশদেশান্তর থেকে চিকিত্সকেরা এলেন যোগ দিতে। গোপালকে রাজা দায়িত্ব দিলেন চিকিত্সক নির্বাচনের। গোপাল খুশিমনে বসলেন তাঁদের মেধা পরীক্ষায়। আপনার চিকিত্সালয়ের আশপাশে ভূতের উপদ্রব আছে?জি আছে। প্রচুর ভূত।

ওদের অত্যাচারে ঠিকমতো চিকিত্সা পর্যন্ত করতে পারি না। দিন দিন ওদের সংখ্যা বাড়ছেই। এবার দ্বিতীয় চিকিত্সকের পালা। আপনার চিকিত্সালয়ের আশপাশে ভূতের উপদ্রব কেমন? আশ্চর্য, আপনি জানলেন কীভাবে! ওদের জ্বালায় আমি অস্থির।

দিন দিন ওদের সংখ্যা বাড়ছেই। এভাবে দেখা গেল সবার চিকিত্সালয়ের আশপাশেই ভূতের উপদ্রব আছে। একজনকে শুধু পাওয়া গেল, যাঁর কোনো ভূতসংক্রান্ত ঝামেলা নেই। গোপাল তাঁকে রাজবৈদ্য নিয়োগ দিলেন। পরে দেখা গেল এই চিকিত্সকই সেরা। রাজাও খুশি। একদিন রাজা ধরলেন গোপালকে।

গোপাল বললেন, ‘আজ্ঞে মহারাজ, দেখুন, সবার চিকিত্সাকেন্দ্রের আশপাশে ভূতের উপদ্রব শুধু বাড়ছে আর বাড়ছে। এর অর্থ হলো, তাঁদের রোগী মরে আর ভূতের সংখ্যা বাড়ে…আর যাঁকে নিলাম, তাঁর ওখানে কোনো ভূতের উপদ্রব নেই…অর্থাত্ তাঁর রোগীএকজনও মরে না।

৫৬. কৃপণ পিসী জব্দ
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের একজন বিধবা পিসী ছিলেন। পিসী নিঃসন্তান হলেও অগাধ বিষয়-সম্পত্তির মালিক। কিন্তু বুড়ি হাড় কৃপণ। বেশী খেলে পয়সা খরচ হবে, তাই কম খেতো। একটা মাত্র ঝি তার দেখাশোনা করত।

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র একদিন গোপালকে বললেন, "গোপাল তুমি যদি আমার পিসীর কাছ থেকে কিছু খসাতে পার-আমি তার দ্বিগুণ টাকা দেব। যতই ভুজং-ভাজং দাও, আমার পিসীর কাছ থেকে একটা আধলাও বের করতে পারবে না"।

গোপাল বলল, "আমি পাথর টিপেও রস বার করতে পারি; আপনার টাকাওয়ালা পিসীর কাছ থেকে নিশ্চয় টাকা খসাতে পারব"।

রাজবাড়ির সর্বত্রই গোপালের অবাধ গতি। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বিশেষ প্রিয়পাত্র হওয়ায় বয়স্করা তাকে সকলেই স্নেহ করতেন। গোপাল পিসীমার মহলের কাছে গিয়ে-‘পিসীমা’ ‘পিসীমা’ বলে ডাকতে লাগল।

-কে, গোপাল নাকি? কি মনে করে? এসো বাবা, বস বাবা, ভাল আছো তো?

গোপাল বলল- এমনিতে ভালোই আছি। গতকাল এক নামকরা গণক ঠাকুরকে হাত দেখিয়েছিলাম। সে বলল- আমার পরমায়ু আর মাত্র ছয় মাস।

-কি বলছো বাছা! এই কি তোমার মরবার বয়স?

গোপাল বলল,- বেশ নামকরা গণক ঠাকুর, অবিশ্বাসই বা করি কি করে? পিসীমা, অনেকদিন ধরেই মনের বাসনা ছিল, আপনার পাতের একটু প্রসাদ পাবার।

পিসীমা বললেন,- বেশ, তুমি কালই এখানে খেয়ো।

-না না পিসীমা, আমি শুধু আপনার পাতের প্রসাদ পাব।

-বেশ, তাই হবে। তুমি কাল এসো।

গোপাল পরদিন স্নান করে কিছু কুঁচো চিংড়ি ভেজে ট্যাঁকের মধ্যে কুঁচো চিংড়ি পুরে পিসীমার বাড়িতে চলে এল।

-পিসিমা, আপনি আগে খেয়ে নিন, আমি আপনার এঁটো পাতেই খেতে বসব।

গোপাল খুবই নাছোড়বান্দা- অতএব পিসীমা নিরুপায়। পিসীমার এঁটো পাতেই গোপাল খেতে বসল। পাতে লাউঘণ্টও ছিল। গোপাল এক ফাঁকে ট্যাঁক থেকে কুঁচো চিংড়িভাজা বের করে লাউঘণ্টের সঙ্গে মিশিয়ে নিল।

অন্যান্য তরকারি দিয়ে খেতে খেতে মাঝে মাঝে একটু লাউঘণ্ট খেতে লাগল। দরজার পাশে ঝি দাঁড়িয়ে, পিসীমা তদারক করছেন।

-আর কিছু লাগবে গোপাল? নিরামিষ খেতে নিশ্চই তোমার কষ্ট হচ্ছে।

গোপাল বলল- কষ্ট হবে কেন, বেশ ভালই হয়েছে। তাছাড়া সবচেয়ে লাউ-চিংড়ি ঘণ্টটা বেশ ভালই হয়েছ।

পিসীমা তো অবাক-কি বলছ গোপাল, ওটা তো শুধু লাউঘণ্ট !

গোপাল ঝিকে ও পিসীকে ডেকে দেখাল- এই তো চিংড়িমাছ রয়েছে। কত চিংড়ি!

পিসীমা বুঝতে পারলেন, এর পর আর অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি গোপালকে বল্লেন,- বুড়ো মানুষ, কি করতে কি করে ফেলেছি। একথা আর কাউকে ব’লো না বাবা, তাহলে আর আমি কারো কাছে মুখ দেখাতে পারবো না।

গোপাল বলল- ছ’মাস পরে মরতে চলেছি। কি করে আর মিথ্যা কথা বলি? আর রাজামশাই আমার অন্নদাতা-তিনি জিজ্ঞেস করলে আমাকে বাধ্য হয়ে সত্য কথাই বলতে হবে। তবে পিসীমা, আপনি ইচ্ছা করলে টাকা দিয়ে আমার মুখের কথা কিনে নিতে পারেন। ছ’মাস পরে যখন মরেই যাচ্ছি-আপনার অনুরোধে ছ’মাস না হয় মুখ বুজেই কাটিয়ে দেব। আপনি ঝিকেও কিছু টাকা দিন, ও যাতে কাউকে কোন কথা না বলে। আর ছ’মাস যদি মুখ বুজে থাকি-আমার আয়-উপায় সবই বন্ধ হয়ে যাবে পিসীমা। ভাঁড়ের মুখ বন্ধ থাকলে কি উপায় আছে? তাই বলছিলাম যদি মোটামুটি অর্থাৎ হাজার পাঁচেক টাকা দেন, তবে আমি মুখ বুজে থাকতে পারি।

-পাঁচ হাজার! ওরে বাব্বা! অতো হেঁকো না গোপাল, তা’হলে তোমার আগেই আমি মারা যাবো। আমি অতো টাকা কোথায় পাব? আমি তিনশো টাকা দিচ্ছি-আর ঝিকেও পঞ্চাশ টাকা দিচ্ছি-এতেই তোমরা একটু চুপ থেকো।

পিসীমা সত্য সত্যই গোপালের হাতে তিনশো টাকা এনে দিলেন।

গোপাল টাকাটা গুণে ট্যাঁকে গুঁজে নিয়ে বলল- খুবই কম হয়ে গেল পিসীমা। তবে আমি মারা গেলে আমার ছেলেপুলেদের একটু দেখবেন পিসীমা, তারা যেন একেবারে ভেসে না যায়।

-তা দেখব বৈকি বাবা।

গোপাল টাকাটা ট্যাঁকে গুঁজে সোজা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে চলে এল।

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র বললেন- আমি তোমাকে ছ’শো টাকা দেবার জন্য তৈরি হয়েই বসে আছি। পিসীমার ঘরে আড়ি পাতার জন্য লোক রেখেছিলাম, সে এসে আমাকে সব কথা বলেছে-আর কিছু বলতে হবে না। সত্যি গোপাল, তুলনা হয় না। অমন কিপটে পিসীমাকে তুমি নাজেহাল করে টাকা নিয়ে এলে?

গোপাল হেসে বলল- সেই জন্যই তো বেশি টাকা দাবি করিনি।

৫৭. এখন গোপাল ভাঁড়
রাজা বললেন, শীতের রাতে কেউ কি সারা রাত এই পুকুরে গলাপানিতে ডুবে থাকতে পারবে?

যদি কেউ পারে, আমি তাকে অনেক টাকাপয়সা, ধনরত্ন পুরস্কার দেব।

এক ছিল গরিব দুঃখী মানুষ। সে বলল, আমি পারব।

সে মাঘ মাসের তীব্র শীতে সারা রাত পুকুরের পানিতে গলা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

ভোরের বেলা সে উঠল পানি থেকে। রাজার কাছে গিয়ে সে বলল, আমি সারা রাত পুকুরের পানিতে ছিলাম।

আপনার সান্ত্রী-সেপাই সাক্ষী। এবার আমার পুরস্কার দিন।

রাজা বললেন, সেকি, তুমি কেমন করে এটা পারলে! গরিব লোকটা বলল, আমি পানিতে সারা রাত দাঁড়িয়ে রইলাম।

দূরে, অনেক দূরে এক গৃহস্থবাড়িতে আলো জ্বলছে। আমি সেই দিকে তাকিয়ে রইলাম। সারা রাত কেটে গেল

। মন্ত্রী বলল, পাওয়া গেছে। এই যে দূরের প্রদীপের আলোর দিকে ও তাকিয়ে ছিল, ওই প্রদীপ থেকে তাপ এসে তার গায়ে লেগেছে।

তাই তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে এই শীতেও ওই পুকুরে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে রেখে দাঁড়িয়ে থাকা।

রাজা বললেন, তাই তো! তাহলে তো তুমি আর পুরস্কার পাও না। যাও। বিদায় হও।

গরিব লোকটা কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নিল। সে গেল গোপাল ভাঁড়ের কাছে।

অনুযোগ জানাল তাঁর কাছে। সব শুনলেন গোপাল ভাঁড়।

তারপর গোপাল ভাঁড় বললেন, ঠিক আছে, তুমি ন্যায়বিচার পাবে।

গোপাল ভাঁড় দাওয়াত করলেন রাজাকে। দুপুরে খাওয়াবেন। রাজা এলেন গোপাল ভাঁড়ের বাড়ি।

গোপাল ভাঁড় বললেন, আসুন আসুন। আর সামান্যই আছে রান্নার বাকি।

কী রাঁধছি দেখবেন, চলেন। গোপাল ভাঁড় রাজাকে নিয়ে গেলেন বাড়ির পেছনে।

সেখানে একটা তালগাছের ওপর একটা হাঁড়ি বাঁধা আর নিচে একটা কুপিবাতি জ্বালানো।

গোপাল ভাঁড় বললেন, ওই যে হাঁড়ি, ওটাতে পানি, চাল, ডাল, নুন সব দেওয়া আছে।

এই তো খিচুড়ি হয়ে এল বলে। শিগগিরই আপনাদের গরম গরম খিচুড়ি খাওয়াচ্ছি।

রাজা বললেন, তোমার বাড়িতে দাওয়াত খাব বলে সকাল থেকে তেমন কিছু খাইনি।

খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। এখন এই রসিকতা ভালো লাগে! রসিকতা কেন, রান্না হয়ে এল বলে।

রাজা বললেন, তোমার ওই খিচুড়ি জীবনেও হবে না, আমার আর খাওয়াও হবে না।

চলো মন্ত্রী, ফিরে যাই। গোপাল বললেন, মহারাজ, কেন খিচুড়ি হবে না।

দূরে গৃহস্থবাড়িতে জ্বালানো প্রদীপের আলো যদি পুকুরের পানিতে ডুবে থাকা গরিব প্রজার গায়ে তাপ দিতে পারে,

এই প্রদীপ তো হাঁড়ির অনেক কাছে। নিশ্চয়ই খিচুড়ি হবে। রাজা তার ভুল বুঝতে পারলেন।

বললেন, আচ্ছা পাঠিয়ে দিয়ো তোমার ওই গরিব প্রজাকে। ওর প্রতি আসলেই অন্যায় করা হয়েছে।

ওকে ডাবল পুরস্কার দেব। সে তো আপনি দেবেনই। আমি জানতাম।

আসুন, ঘরে আসুন। দুপুরের খাওয়া প্রস্তুত।

তারপর রাজা সত্যি সত্যি গরিব লোকটাকে অনেক পুরস্কার দিয়েছিলেন।

৫৮. বাবা প্রায়ই আপনাদের বাড়ী যেতেন
এক বিয়ে বাড়ির আসরে মধ্যবয়স্ক এক ভদ্রলোক গোপালকে জব্দ করার উদ্দেশ্যে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল - গোপাল, তোমার সঙ্গে আমার তো অদ্ভুত মিল। সত্যি সচরাচার এমন মিল দেখা যায় না। কি বল?

গোপাল- তা যা বলেছেন।

রসিক ভদ্রলোক- যা সত্যি সবাইকে তা মেনে নিতেই হয়। আচ্ছা গোপাল, তোমার মা নিশ্চয় মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে আসত। নইলে তোমার আমার চেহারায় এমন মিল হয় কি করে?

ভদ্রলোকের কথা শেষ হতে না হতেই আসরে হাসির রোল উঠল। সবাই ভাবল, গোপাল ভাঁড় এবার বেশ জব্দ হয়েছে।

গোপাল কিছুমাত্র বিচলিত না হয়ে বলল- আমার চেহারার সঙ্গে আমার বাপের চেহারার অদ্ভুত মিল। যতদূর জানি, আমার বাবা প্রায়ই আপনাদের বাড়ি যেতেন। আর সেই জন্য মা বাবাকে খুব বকাবকি করতেন।

গোপালের কথায় আসরে আবার হাসির রোল উঠল। গোপালের সঙ্গে রসিকতা করতে এসে মধ্যবয়স্ক লোকটিকেই আসর ছেড়ে পালাতে হলো।

৫৯. বলদের মতো চারটা পা
গোপালের তখন বয়স হয়েছে। চোখে ভালো দেখতে পারে না।

রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বললেন, কী গোপাল, গতকাল আসনি কেন?

আজ্ঞে চোখে সমস্যা হয়েছে। সবকিছু দুটো দেখি। কাল এসেছিলাম।

এসে দেখি দুটো দরবার। কোনটায় ঢুকব, ভাবতে ভাবতেই…।

এ তো তোমার জন্য ভালোই হলো। তুমি বড়লোক হয়ে গেলে।

আগে দেখতে তোমার একটা বলদ, এখন দেখবে দুটো বলদ।

ঠিকই বলেছেন মহারাজ।

আগে দেখতাম আপনার দুটো পা, এখন দেখছি চারটা পা…ঠিক আমার বলদের মতোই!

৬০. গোপাল ভাঁড়ের আইফোন ৫
মহারাজ একদিন গোপাল ভাঁড়কে ডেকে বললো, "কি গোপাল, শুনলাম বাজারে নাকি নতুন আইফোন ৫ চলে এসেছে এবং উহা নাকি লম্বায় আগের আইফোন গুলোর থেকে বড়"

তখন গোপাল বললো, "জি মহারাজ লম্বায় তো বড় হবেই সেই ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত রোজ রোজ হরলিক্স এর ডোজ পড়েছে যে, আর লম্বার পাশাপাশি এটা শক্তি ও বুদ্ধিতেও অনেক বেশী"

৬১. গোপাল চাদর
গোপালের গিন্নী একটা শব্দ পেয়ে ছুটে গেছে গোপালের কাছে।

কি হল? কিসের শব্দ?

গোপাল বলল,চাদরটা পড়ে গিয়েছিল।

তাতেই এত শব্দ?

গোপাল বলল,আমিও যে চাদরের মধ্যে ছিলাম।

৬২. "নাম ধরে ডাকছি, কারণ"
গোপাল ভাঁড় একবার তার ছেলেকে নিয়ে মেলায় বেড়াতে গিয়ে ছেলেকে হারিয়ে ফেলে। ছেলে তখন একটুও না ঘাবড়ে ‘গোপাল, গোপাল’ বলে চেঁচাতে থাকে।

ছেলের চিৎকার শুনে গোপাল ছুটে এসে ধমক দেয় ছেলেকে, ‘ছিঃ ছিঃ, আমার নাম ধরে ডাকছিস, বাবা বলে ডাকতে পারিস না?’

ছেলে তখন বলল, ‘হুঁ, বাবা বলে ডাকি আর মেলার সব লোক ছুটে আসুক!’

৬২. "সাবধান থাকবে"
রামবাবুর সাথে গল্প করতে করতে গোপালের খুব তেষ্টা পেয়েছে।

সে ওর ভৃত্যকে ডেকে ঠাস ঠাস তিনটে চড় লাগিয়ে দিয়ে বলছে,

‘যা এক ঘটি জল নিয়ে আয়! ঘটি যেনো না ভাঙে।’

ব্যাপার দেখে রামবাবু বলছে, ‘গোপাল, ঘটি ভাঙার আগেই ওকে চড় মেরে বসলে যে?’

গোপাল জবাব দিচ্ছে, ‘আরে ভেঙে ফেলার পর মেরে কি আর লাভ আছে?

এর চেয়ে আগেই মেরে দিলাম। সাবধান থাকবে।’

৬৪. "ব্যবধান"
রাজা গোপাল ভাঁড় কে প্রশ্ন করল, গাধা আর তোমার মধ্যে ব্যবধান কতটুকু?

গোপাল রাজা থেকে  দুরত্ব টা মেপে

তারপর জবাব দিল, বেশি না, মাত্র সাড়ে চার হাত ব্যবধান।

৬৫. "ভেট-নাই তাই-ভিড়"
একবার গোপাল আহলাদপুর রেড়াতে এসেছিল। নতুন যায়গায় ঘুড়তে ঘুড়তে এক অজানা যায়গায় উপস্থিত হল। সেদিন সেখানে ছিল উৎসব তিখি। সামনে বিশাল আটচালা সাজানো। মধুর গান বাজছে তা বাহির থেকে শোনাও যাচ্ছে।

পেছনে মন্দির দেখা যাচ্ছেনা সামনে থেকে। ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা প্রশের করছে ভিড় করে দলে দলে। রাস্তায় দাড়িয়ে গোপাল সেদিকেই তাকিয়ে ছিল।

তরেও ইচ্ছে সেও একবার ভিতরে গিয়ে দেখে কি জাতীয় তামাসা হচ্ছে ওখানে। ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলঃ “এখানকার টিকিটের দাম কত ভায়া?”

দারোয়ানঃ “সে কি? এখনে তো কোন টিকিট লাগে না। বিনা পঁয়সায় মেলা দেখা যায়”

গোপাল যেন অকুলে কুল পেল, ভুরু নাচিয়ে বলে উঠলঃ “ভেট লাগে না বলেই এত ভিড়”

এই বলে গোপাল ঢুকে পড়ল ভিড়ের মাঝে আনন্দের লোভে।

দম ফাটানো হাসির কৌতুক

0 Comments:

Post a Comment

♥সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ... আবার আসবেন..♥